আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গভীর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হুমকি, ইরানের কঠোর অবস্থান এবং মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুয়েজ খাল ও বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সামুদ্রিক পরিবহন ব্যয় এবং যুদ্ধঝুঁকির বিমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
জ্বালানি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সার তথ্যানুযায়ী, লোহিত সাগরে তেল বোঝাই করার পর ট্যাংকারগুলোর সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল পরিবহন বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর থেকে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। অপর এক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু থেকে বাব আল-মানদেব হয়ে এশিয়ামুখী দক্ষিণমুখী রুটে তেলের প্রবাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত জুনে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে রওনা হওয়া তেলের ৮১ শতাংশ লোহিত সাগরের দক্ষিণ রুট ব্যবহার করলেও জুলাইয়ে তা কমে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
হামলার ঝুঁকি এড়াতে অনেক ট্যাংকার অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বা অবস্থান শনাক্তকারী ট্র্যাকার বন্ধ রেখে চলাচল করছে। কিছু জাহাজ ঝুঁকিপূর্ণ পথ সম্পূর্ণ এড়িয়ে চললেও নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের মালিকানাধীন ট্যাংকার বিশেষ বিবেচনায় ওই পথ অতিক্রম করছে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি ট্যাংকার আটকে রাখলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো জ্বালানি রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছে ইরান। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের সব ধরনের জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছে, যার আওতায় ইয়ানবু বন্দর থেকে ভূমধ্যসাগরের অভিমুখে যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলোও পড়েছে।
মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে হামলার পর সুয়েজ খাল অভিমুখে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা পর্যালোচনা শুরু করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো। জ্বালানি মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা আর্গাস ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ড্রায়াড গ্লোবাল জানিয়েছে, এ অঞ্চলে জাহাজ ও অবকাঠামোর ওপর ঝুঁকি বাড়ায় বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ দাবি করতে পারে। এতে জাহাজ চলাচলের মূল খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সুয়েজ খাল এবং বিকল্প পথ ব্যবহারের ফলে তেল পরিবহনের পথ দীর্ঘ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বাব আল-মানদেবের পরিবর্তে সুয়েজ খাল বা বিকল্প রুট ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় জ্বালানি পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বা প্রায় এক মাস অতিরিক্ত সময় লাগছে। এর ফলে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো সরবরাহ সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাছাড়া, অত্যন্ত বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো (ভিএলসিসি) পূর্ণ লোড অবস্থায় সুয়েজ খাল অতিক্রম করতে পারে না। ফলে ‘সুমেদ’ পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল খালাস করে খালাসের পর ভূমধ্যসাগরে তা পুনরায় জাহাজে তুলতে হয়, যা সামগ্রিক পরিচালন সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কেপলারের প্রধান ফ্রেইট বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই ধমনীতে কোনো দীর্ঘমেয়াদী বিঘ্ন ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে। দীর্ঘ সামুদ্রিক রুট, বর্ধিত শিপিং ভাড়া এবং সরবরাহের বিলম্ব সরাসরি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক ভোক্তা পর্যায়ে।