আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (১ আগস্ট) ভোরে পরিচালিত এই হামলায় একটি বহুতল আবাসিক ভবনের একাংশ ধসে পড়ে মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়। ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কয়েকজন বাসিন্দা আটকা পড়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিটসকো। রক্তক্ষয়ী এই ঘটনায় গুরুতর আহত অন্তত পাঁচজনকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই কিয়েভের সামরিক ও বেসামরিক জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
কিয়েভ নগর প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতের শেষভাগে হঠাৎ করেই রাজধানীজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বা সাইরেন বেজে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরই শহরজুড়ে এক ডজনেরও বেশি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শক্তিশালী এই বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকার বহুতল ভবনগুলো কেঁপে ওঠে এবং আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ছুটে যান। একাধিক প্রশাসনিক এলাকায় হামলা চালানো হলেও সোলোমিয়ানস্কি ও শেভচেনকিভস্কি জেলাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার পর কিয়েভের আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং একাধিক স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিটসকো জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ধসে পড়া অংশটিতে কয়েকজন নাগরিক আটকা পড়ে আছেন, যাদের বের করে আনতে উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রের প্রভাবে শহরের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ভবন ও শিল্প পণ্যের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দমকল বাহিনীর একাধিক ইউনিট কায়িক পরিশ্রমে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও বহু অবকাঠামো ভস্মীভূত হয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভকে লক্ষ্য করে রাশিয়া তাদের বিমান ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের রণকৌশলকে স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগ করছে। একই সাথে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মারাত্মক ঘাটতিতে ভুগছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ব্যবহৃত অত্যন্ত উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো সামরিক প্রযুক্তি বর্তমানে কিয়েভের প্রতিরক্ষা বহরে অপ্রতুল। শব্দের গতির চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেন সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা মিত্রদের কাছে উন্নত পেট্রিয়ট এবং অন্যান্য দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সরবরাহের জোর দাবি জানানো হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা সরবরাহে বিলম্ব এবং প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের অপ্রতুলতার কারণে কিয়েভ সহ অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র শহরের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় আঘাত হানছে, যা সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজধানী কিয়েভে এই ভয়াবহ হামলা চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। একই সাথে এটি ইউক্রেনের নাগরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ঘটনার পর থেকে কিয়েভের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘিরে রেখে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করছেন। কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।