আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারত ও দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে আসামে তীব্র বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার প্রথম ঢেউয়ের আঘাতেই রাজ্যের অন্তত ছয়টি জেলায় ২২ হাজারেরও বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্রহ্মপুত্র নদসহ আসামের প্রধান প্রধান উপনদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে।
আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এএসডিএমএ) সর্বশেষ সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের ধেমাজি, নলবাড়ি, ডিব্রুগড়, চিরাং, লখিমপুর ও কোকড়াঝাড় জেলায় মোট ২২ হাজার ১২৪ জন বাসিন্দা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ধেমাজি জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জেলাটিতে প্রায় ১৫ হাজার ৪৮৩ জন মানুষ বর্তমানে পানিবন্দী অবস্থায় চরম সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। শিবসাগর জেলার নাঙ্গলামুরাঘাট এলাকায় দিসাং নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা আশপাশের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বন্যার পানির তীব্র স্রোতে আসামের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, বন্যা পরিস্থিতির কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৬টি গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সাথে প্রায় ১ হাজার ৬৯০ হেক্টর ফসলি জমি পুরোপুরি বিনষ্ট হয়ে গেছে, যার ফলে স্থানীয় কৃষকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু মানুষের বসতি নয়, বন্যা ও চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৪৮ হাজার ১৯৯টি গবাদি পশু ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলোতে পশু খাদ্য ও নিরাপদ সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
এদিকে ক্রমাগত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ধেমাজি জেলায় শিমেন নদীর ওপর নির্মিত একটি ঐতিহাসিক রেলসেতু আংশিক ধসে পড়েছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (এনএফআর) কর্তৃপক্ষ এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, ধেমাজি এবং এর সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় গত কয়েকদিনে ১১০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নজিরবিহীন এই বৃষ্টিপাতের ফলে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে এবং ১৯৬৫ সালে নির্মিত সেতুটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পিলারের নিচের মাটি ধসে যায়। এর ফলে স্তম্ভটি ভারসাম্য হারিয়ে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তবে নদীতে পানির বেগ বৃদ্ধির পূর্বাভাস থাকায় আগেই উক্ত রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
সেতুটি আংশিক ধসে পড়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে তিনসুকিয়া বিভাগের অন্তর্গত মুরকংসেলেক ও সিলাপাধারের মধ্যে সমস্ত ট্রেন চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে এই রুটের দূরপাল্লার ট্রেনগুলো সিলাপাথার স্টেশনে যাত্রা শেষ করছে এবং সেখান থেকেই আবার ফিরতি যাত্রা শুরু করছে। রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিশেষ বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত ও আটকে পড়া যাত্রীদের তাৎক্ষণিক তথ্য এবং জরুরি সহায়তা প্রদানের জন্য ধেমাজি, সিলাপাথার ও মুরকংসেলেক রেলওয়ে স্টেশনে সার্বক্ষণিক বিশেষ হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে। বর্তমানে আসামের স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও রাজ্য দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সেতুটি সংস্কারের প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।