সারাদেশ ডেস্ক
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাস থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের (১৪) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা এই মামলায় লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খানসহ ১৭৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিরা সবাই বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। গত সোমবার রাতে রামগঞ্জ থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করার পর পুলিশ ইতিমধ্যে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর আগে গত ১৬ জুন ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাস থেকে শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনার পর নিহত শিক্ষার্থীর বাবা জিয়া উদ্দিন বাদী হয়ে রামগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় অভিযোগ করা হয়, মেহেদী হাসানকে মুঠোফোন চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই মামলায় আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৯ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়। শিক্ষার্থী মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুব্ধ জনতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সামনে জড়ো হতে থাকেন, যার ফলে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই দিন রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ লোকজন একাডেমির ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমিতে ভাঙচুর, মারধর ও নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা দ্বিতীয় মামলাটির বাদী রবিউল হাসান নামের এক ব্যক্তি, যিনি উপজেলার দেবনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। এই মামলায় ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে রামগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন খানকে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৬ জুন ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির সামনে আসামিরা দলবদ্ধ হয়ে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে বেআইনি জনতা সাজে অগ্রসর হন। বাদী ও সাক্ষীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে আসামিরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে মারধর ও গুরুতর জখম করেন। একই সময়ে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর ও তছনছ করেন। এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ ও জনরোষকে পুঁজি করে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো। এই হামলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ আসবাবপত্র ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে, এই মামলায় কারাগারে থাকা এক ব্যক্তিকে আসামি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মামলার ১৪ নম্বর আসামি রামগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের কর্মী তুহিন মালিক দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মামলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, ঢাকায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় গত ৩ জুন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৭ জুন আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফলে ১৬ জুন রামগঞ্জের ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমিতে যখন হামলার ঘটনা ঘটে, তখন তিনি কারান্তরীণ ছিলেন। ঘটনার সময় নিজের অনুপস্থিতি এবং কারাগারে থাকার বিষয়টি সরকারি নথিপত্রের মাধ্যমে সহজেই যাচাই করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই মামলায় তাঁকে জড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমিতে হামলা ও নাশকতার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কারাগারে থাকা ব্যক্তিকে আসামি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক আসামির ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হবে। তদন্ত চলাকালীন যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তি ঘটনার সময় কারাগারে ছিলেন কিংবা ঘটনাস্থল থেকে দূরে অন্য কোথাও অবস্থান করছিলেন, তবে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। বর্তমানে ওই একাডেমি ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।