বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও গতিশীল করার লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পেরদানা পুত্রা’ ভবনে এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে প্রথমে একটি একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাদের যৌথ নেতৃত্বে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দ্বিপাক্ষিক প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানসহ আটজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার পক্ষে দেশটির শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ও কূটনীতিকরা অংশ নেন। আলোচনায় দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে শ্রমবাজারের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় উন্মুক্তকরণ, দেশটির বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বর্তমানে কর্মরতদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে বৈধ কাগজপত্রহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিতকরণ এবং তাদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে দুই নেতার মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান স্মরণ করে এই বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।
বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উৎপাদিত আম, বিভিন্ন প্রকার ফলমূল এবং শাকসবজি মালয়েশিয়ার বাজারে সহজ শর্তে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, শিক্ষা ও কৃষি খাতে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিরা দ্বিমুখী আলোচনা করেন। একই সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের (ASEAN) সেক্টোরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আবেদন এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (RCEP) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন কামনা করা হয়।
বৈঠকে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে মালয়েশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অবস্থান আরও জোরদার করার ব্যাপারে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করে।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতি বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন (counter-terrorism) বিষয়ে যৌথ গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও সহজীকরণ সংক্রান্ত আরেকটি দ্বিপাক্ষিক দলিল (Exchange of Notes) বিনিময় করা হয়। উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা স্ব স্ব দেশের পক্ষে এসব দলিলে স্বাক্ষর ও বিনিময় করেন। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্তের সূচনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দুই দিনের সরকারি সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি চীন সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।