নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে লাইসেন্সিং ও অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি কমাতে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইনভিত্তিক ওয়ান-স্টপ উইন্ডো ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যার মাধ্যমে এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রবিবার সকালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জেবিসিসিআই সভাপতি তারেক রাফি ভূঁইয়ার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্প স্থাপন এবং টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, কোনো ভৌত স্থাপনা বা শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়া বাস্তব অবকাঠামোগত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় তা ১৫ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে শেষ করা সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ ধরনের স্থাপনায় জাতীয় নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল দিক খতিয়ে দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বাস্তব ক্ষেত্রে স্থাপনা পরিদর্শন করেই চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। তবে বিনিয়োগ কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকার অস্থায়ী বা প্রভিশনাল লাইসেন্স দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুততম সময়ে তাদের প্রাথমিক অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন।
অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা কমিয়ে আনার জন্য এরই মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে খাতভিত্তিক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। কারণ একেক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র ভিন্ন হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়া ও পরিবেশগত শর্তাবলি কখনোই টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে এক হবে না।
শিল্পকারখানা পরিদর্শন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও হয়রানিমুক্ত করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার পরিদর্শন কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে। বিডা নির্দিষ্ট পরিদর্শনের তারিখ নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে একত্র করবে এবং একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে একবারেই যৌথ পরিদর্শন সম্পন্ন করা হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের বারবার বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হতে হবে না, যা ব্যবসার খরচ এবং সময় দুটোই সাশ্রয় করবে।
সভায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে চায়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট প্রমাণ করেছে যে, ডিজেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সংকটকালে জাতীয় সরবরাহ চেইনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকার দেশের সামগ্রিক যানবাহন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড প্রযুক্তির দিকে রূপান্তর করতে অত্যন্ত আগ্রহী এবং মন্ত্রিসভায় এ বিষয়ে ইতিবাচক নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ অবকাঠামো বিবেচনা করে বাংলাদেশ এখনই পুরোপুরি বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই বাস্তবতার নিরিখে সরকার আপাতত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির আমদানি ও ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাপানকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সময়, ব্যয় ও আইনি জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করাই এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতির প্রশংসা করে জেবিসিসিআই নেতারা বলেন, এই চুক্তি চূড়ান্ত হলে দুই দেশের বাণিজ্য, শুল্ক সুবিধা ও বিনিয়োগ সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। একই সাথে তা বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।