বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৫ হাজার মিডওয়াইফ (ধাত্রী) নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল ধারাকে প্রথাগত চিকিৎসা-নির্ভরতা থেকে পরিবর্তন করে রোগ প্রতিরোধ-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রবিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত ৩৪তম ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব মিডওয়াইভস (আইসিএম) ট্রায়েনিয়াল কংগ্রেসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণসহ তার সাম্প্রতিক ইউরোপ সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, চলতি মাসের ১২ তারিখে পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত আইসিএম-এর ৩৪তম আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে বাংলাদেশ অংশ নেয়। তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এই বৈশ্বিক সম্মেলনে বিশ্বের ১২২টি দেশ থেকে তিন হাজারেরও বেশি মিডওয়াইফ, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বেশ কয়েকটি দেশের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরাও এতে অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকে এই কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী।
সম্মেলনের মূল প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (প্রাইমারি হেলথকেয়ার) খাতকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করা। বাংলাদেশের প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থা মূলত হাসপাতাল ও নিরাময়-কেন্দ্রিক। সরকার এই ধারা পরিবর্তন করে প্রিভেনশন সেন্ট্রিক বা রোগ প্রতিরোধ-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নতুন স্বাস্থ্যকর্মী মাঠপর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে জানানো হয়, গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ প্রসবের সুবিধা নিশ্চিত করতে এই ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশের কোনো প্রসূতি মা যাতে উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন। গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক প্রসব বা ডেলিভারির জন্য যেন অনতিবিলম্বে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে সরকার।
নতুন এই রূপরেখা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে এবং শহরাঞ্চলের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিট) স্থাপন বা সুসজ্জিত করা হবে। তৃণমূল পর্যায়ের এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেই প্রসূতি মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের যাবতীয় ব্যবস্থা থাকবে। সার্বক্ষণিক ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ন্যূনতম দুজন করে পেশাদার মিডওয়াইফ সার্বক্ষণিক কর্তব্যরত থাকবেন।
দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই বিশাল জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ নিজ এলাকাতেই প্রাথমিক চিকিৎসার সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন, যা সার্বিক জাতীয় স্বাস্থ্য সূচকের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।