বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই এবং স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। প্রায় এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই সম্ভব নয় এবং রোহিঙ্গারাও নিজের দেশে ফিরে যেতে চায়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এ বিষয়ে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারকেই নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে এই বিপুল জনসংখ্যার মানবিক দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের একার পক্ষে এখন আর টেকসই নয়।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রায় আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানবিক আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং নিরাপত্তাজনিত মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাম্পগুলোর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ এবং বিশাল বনভূমি উজাড় হওয়ার মতো পরিবেশগত বিপর্যয় এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করার জোর আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ ও মধ্যস্থতা ছাড়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন সংস্থাকে এ বিষয়ে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, এটি সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সাথে যুক্ত। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক উভয় পথেই এই সংকটের সমাধানের চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের অনীহা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার থমকে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির এই বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং এটি আন্তর্জাতিক মহলে পুনরায় রোহিঙ্গা সংকটকে মূল আলোচনায় নিয়ে আসার একটি বড় কূটনৈতিক প্রয়াস।
বাংলাদেশ আশা করে, বিশ্ব সম্প্রদায় কেবল মানবিক সহায়তার মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং সংকটের মূল কারণ দূর করে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে টেকসই পুনর্বাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে।