বিশেষ প্রতিবেদক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রার্থী বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা প্রত্যক্ষ ভোট প্রদান করেন। নির্বাচনে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পেয়েছেন ৯১ ভোট। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এই বিজয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রস্তুতির ঘাটতি ও সময়ের সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ফলে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার জন্য বাংলাদেশ সময় পায় মাত্র তিন মাস। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে বিগত এক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল।
সীমিত সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের এই বিজয়কে দেশের ইতিহাসে অন্যতম সফল কূটনৈতিক তৎপরতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বল্পতম সময়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করে। ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে এবারের প্রচারণা সমন্বয় করা হয়।
এই নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বজুড়ে থাকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তিন মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ফোরামে নিবিড় প্রচারণা চালায়।
কূটনীতিকদের মতে, গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগ’ বা পারস্পরিক সংলাপটি বাংলাদেশের বিজয়ের পথ সুগম করে। সাধারণ পরিষদের তৎকালীন সভাপতি আনালেনা বায়েরবকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আড়াই ঘণ্টাব্যাপী ওই সংলাপে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান তাঁর দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা ও ‘ভিশন স্টেটমেন্ট’ উপস্থাপন করেন। নির্বাচিত হলে সাধারণ পরিষদ পরিচালনায় তাঁর অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরলে তা বিশ্বজুড়ে কূটনীতিকদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এই সংলাপের পরই প্রায় ৩০টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে।
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রচারণায় মূল প্রতিপাদ্য ছিল কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়ন, বিশ্ব শান্তিতে অবদান রাখা এবং গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো বাংলাদেশের নীতিতে গুরুত্ব পায়। বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংকটের মুখে বাংলাদেশ সংলাপ ও ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়।
এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের পর সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক উন্নয়নে জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আগামী অধিবেশনে বাংলাদেশের এই সভাপতিত্ব বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।