স্বাস্থ্য ডেস্ক
দেশের তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য ও আধুনিক করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘হেলথ স্ক্রিনিং’ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ৬ থেকে ১০টি উপজেলার একটি করে ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) এই কার্যক্রম শুরু হবে। এই পাইলট প্রকল্প সফল হলে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
বুধবার (৩ জুন) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন সরকারের এসব নতুন পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা এবং প্রাথমিক পর্যায়েই বিভিন্ন জটিল রোগ শনাক্ত করার উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই কার্যক্রমে একটি বিশেষ মেডিকেল কিট বক্স ব্যবহার করা হবে। এই কিট বক্সের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর রক্ত, ইউরিন ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাড়ির আঙিনায় বসেই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ স্বল্প সময়ে ও বিনামূল্যে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ পাবেন, যা দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
ব্রিফিংয়ে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বেশ কিছু অবকাঠামোগত ও জনবল কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়। মন্ত্রী জানান, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় থেরাপিউটিক সেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে একজন নারী ও একজন পুরুষ ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের বিদ্যমান ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত উন্নয়নমূলক কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার পরিধি ও মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে সরকার শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ নজর দিচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি আধুনিক ও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই হাসপাতালগুলোর প্রতিটিতে আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, যা আঞ্চলিক পর্যায়ে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে এবং জটিল চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি সহজতর করতে ভূমিকা রাখবে।
নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীদের জন্য পাঁচটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এর পুরোনো ভবনটি ভেঙে নতুনভাবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর পর্যন্ত চিকিৎসা অবকাঠামোর এই সামগ্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সরকারের মূল লক্ষ্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করা বলে ব্রিফিংয়ে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।