অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যে বড় ধরনের ওঠানামা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক শান্তি আলোচনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আগের কার্যদিবসে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বহাল থাকায় বাজার এখনো স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৭৫ সেন্ট বা ০.৭৯ শতাংশ কমে ৯৪.২৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮৫ সেন্ট বা ০.৯২ শতাংশ কমে ৯১.৩১ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগের দিন সোমবার বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় উভয় ধরনের তেলের দাম এক লাফে ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। অথচ সদ্য সমাপ্ত মে মাসজুড়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তির আশায় বাজার সাময়িকভাবে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও নীতিগত কোনো বড় পরিবর্তন না আসায় স্থবিরতা কাটছে না। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনা বন্ধের ইঙ্গিত দিলেও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এরপর আরেকটি সাক্ষাৎকারে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি সম্ভব হতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের এই পরস্পরবিরোধী ও দ্রুত পরিবর্তনশীল অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সতর্ক থাকছেন।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব তেলের বাজারের বর্তমান গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বাস্তব অগ্রগতি এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে। এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক ট্যাংকার চলাচলের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই তেলের দামে যুক্ত হওয়া ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য বা ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ নির্ধারিত হবে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের অংশ হিসেবে সোমবার লেবানন আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে, যা হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত সাময়িক কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা এটিকে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের একটি ইতিবাচক কিন্তু ক্ষুদ্র পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে সুনির্দিষ্ট চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বাজারে এই অস্থিরতা বজায় থাকবে।
ভূরাজনৈতিক এই সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে অ-ইরানি জাহাজ চলাচল কার্যত সীমিত হয়ে পড়ায় বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পূর্বের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের শোধনাগারগুলোতে মার্কিন তেলের নির্ভরতা ও চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ফলস্বরূপ, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৫৬ লাখ ব্যারেলের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।
একই সময়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মজুত হ্রাসের পূর্বাভাস মিলেছে। ২৯ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল কমেছে এবং একই সঙ্গে ডিজেল ও পেট্রোলের মজুতও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিপিং খাতের এক বৈঠকে বৈশ্বিক নৌ-পরিবহন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো শান্তিচুক্তিতে অবশ্যই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের স্পষ্ট আইনি গ্যারান্টি থাকতে হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক ও ঝুঁকিমুক্ত পণ্য পরিবহন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ চেইন এবং তেলের বাজার স্থিতিশীল হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।