বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে দেশে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায়, যা আগের চেয়ে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামলেও মূলত ঋণের ওপর সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ঋণের স্থিতি বা পরিমাণ বেড়েছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই নীতি সহায়তার মাধ্যমে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের বড় ধরনের সুযোগ দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনেকেই ব্যাংকের সিআইবি তালিকা থেকে নাম কাটাতে নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়েছেন। এরপরেও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি ঋণ যে হারে আদায় হওয়ার কথা ছিল, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেই আদায় নিশ্চিত করা যায়নি। একই সময়ে আগের খেলাপি ঋণের ওপর নিয়মিত উচ্চ সুদ যুক্ত হতে থাকায় সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নীতি সহায়তার আওতায় যেসব গ্রাহক ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন, তারা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল সুবিধা নিয়েছেন। ফলে এই মুহূর্তে তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা আদায় হচ্ছে না। এই গ্রেস পিরিয়ডের মেয়াদ শেষ হলে আদায়ের গতি ও পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনের আগে যারা ঋণ রিশিডিউল বা পুনঃতফসিল করেছিলেন, তারা মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট জমা দেওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো তহবিল ব্যাংকে আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রেকর্ড করা হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সে সময় মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছিল, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় বেশ কিছু বড় অংকের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করার মাধ্যমে গত ডিসেম্বর শেষে তা কিছুটা কমিয়ে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। তবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সেই সুফল ম্লান হয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও পৌনে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল। অর্থনীতিবিদদের মতে, আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল কাগজের কলমে ঋণ নিয়মিত করার কারণেই খেলাপি ঋণের এই চক্রাকার বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।