নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতে দীর্ঘ ১৭ মাস কারাভোগের পর অবশেষে দেশে ফিরেছেন ৩৬ জন বাংলাদেশি যুবক। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দেশের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহার দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে ভারতের পেট্রাপোল চেকপোস্ট দিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবাসন আইনের আওতায় তাদের বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বেনাপোল আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে দেশে ফেরা এই যুবকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অধিবাসী। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফেরত আসা ব্যক্তিদের বাড়ি বগুড়া, খুলনা, নাটোর, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
ফেরত আসা যুবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন। ভারতের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় (গার্মেন্টস) উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালাল চক্রটি তাদের অবৈধভাবে সীমান্ত পার করায়। তবে ভারতে প্রবেশের পর পরই তারা প্রতারণার শিকার হন এবং ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন। পরবর্তীতে বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং ভারতীয় আদালতের নির্দেশ মোতাবেক তাদের চেন্নাই সেন্ট্রাল কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘ ১৭ মাস বন্দিজীবন কাটানোর পর দুই দেশের কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবশেষে তারা নিজ দেশে ফেরার আইনি সুযোগ পান।
বেনাপোল ইমিগ্রেশনে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ফেরত আসা যুবকদের বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশের উপস্থিতিতে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংস্থাটি মূলত মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের কাজ করে থাকে। ইমিগ্রেশন ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে যুবকরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সংস্থার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে রাতেই তাদের নিজ নিজ পরিবারের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে এই প্রত্যাবর্তনের অন্তরালে কিছু গুরুতর অভিযোগ এবং উদ্বেগজনক তথ্যও সামনে এসেছে। ফেরত আসা যুবকদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, ভারতের কারাগারে থাকাকালীন দেশে ফিরিয়ে আনার নাম করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুবকদের দাবি, ভারতের বিভিন্ন কারাগারে এখনো প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যাদের অনেকেই একইভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে সীমান্ত পার হয়েছিলেন। এই বন্দিদের দ্রুত মুক্তির জন্য কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর ফিল্ড অফিসার শরিফুল ইসলাম এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র এই যুবকদের ভারতে পাচার করেছিল। তারা প্রত্যেকেই চরম প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যেহেতু তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক, তাই আইনি আনুষ্ঠানিকতা এবং কাউন্সেলিং শেষে রাতেই তাদের নিজ নিজ বাড়িতে নিরাপদে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাপস কুমার আঢ্য জানান, ভারত থেকে ফেরত আসা ৩৬ জন বাংলাদেশিকে ইমিগ্রেশন ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক আইনি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলেই এই যুবকদের দ্রুত এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়েছে। তবে সীমান্ত পথে মানব পাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে দেশের সীমান্ত এলাকাসমূহে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি পাচারকারী দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।