নিজস্ব প্রতিবেদক
টেক্সটাইল শিল্পকে টেকসই রূপ দিতে হলে সবার আগে এই শিল্পখাতকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষম ও আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি উল্লেখ করেছেন, দেশের প্রধান এই শিল্পখাত যদি কোনো কারণে সংকটে পড়ে, তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টারে (জেডিপিসি) আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘কর্মসংস্থানে টেকসই উত্তরণ: টেক্সটাইল শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও পথচলা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে বস্ত্র খাতের কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে।
সেমিনারে সরকারের ভবিষ্যৎ শিল্পনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সরকার নতুন করে আর কোনো মিল বা কলকারখানা সরাসরি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় স্থাপন কিংবা পরিচালনার পরিকল্পনা করছে না। তিনি বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসা পরিচালনার মূল দায়িত্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের। সরকারের মূল ভূমিকা হবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা প্রদান করা।
দেশের টেক্সটাইল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের বিদ্যমান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম দ্রুত সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই কারিকুলাম নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করার বিষয়ে তিনি জোর দেন।
শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় সক্ষম বেসরকারি মিলগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেন। এর ফলে টেক্সটাইল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ হবে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষার্থীরা সরাসরি কারখানায় বাস্তব শিল্প অভিজ্ঞতা বা হ্যান্ডস-অন ট্রেইনিংয়ের সুযোগ পাবে।
বস্ত্র খাতের বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংকিং ঋণের উচ্চ সুদ তথা কস্ট অব ফান্ড এবং আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বর্তমানে এই খাতের প্রধান অন্তরায়। সরকার এই জটিলতাগুলো নিরসনে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের হিস্যা ধরে রাখতে প্রথাগত সুতি কাপড়ের বাইরে ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার, বৈচিত্র্যময় নতুন পণ্য উন্নয়ন এবং ভ্যালু চেইনে আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে খাতটিকে আরও প্রতিযোগিতাসক্ষম করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান। মূল প্রবন্ধ বা কি-নোট পেপার উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্বাসউদ্দীন শায়ক। প্রবন্ধের ওপর প্যানেল আলোচক হিসেবে টেক্সটাইল খাতের বাস্তব চিত্র ও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন ব্লু প্ল্যানেটের নির্বাহী পরিচালক কাজী মাসুম রাশেদ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজীজ রাসেল।
এছাড়া মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে টেক্সটাইল শিক্ষার প্রায়োগিক দিক ও সংকট নিয়ে কথা বলেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) অধ্যাপক ড. আব্দুস শহীদ, গোপালগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী রনি গাজী এবং সিরাজগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. কবির। সেমিনারে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানগণ, বস্ত্র খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টেক্সটাইল খাতের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।