আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বৈজ্ঞানিক এই পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আগামীকাল রবিবারের (২৪ মে) মধ্যেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান জানান, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর আজই অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করার কাজ সম্পন্ন করা হবে। কোনো জটিলতা তৈরি না হলে আগামীকাল রবিবারের মধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে এই মামলার চার্জশিট আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া সম্ভব হবে। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করা হচ্ছে।
এর আগে, গত বুধবার (২০ মে) মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ আসামির এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে আসামি সোহেল রানা অপরাধের দায় স্বীকার করে জানান, ঘটনার পূর্বে তিনি ইয়াবা নামক মাদক সেবন করেছিলেন। মাদক গ্রহণের পর তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এই বিকৃত ও নৃশংস অপরাধ সংঘটিত করেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জবানবন্দি ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা নিজ ঘর থেকে বের হয়। এ সময় আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার শিশুটিকে কৌশলে তাদের ঘরের ভেতরে ডেকে নেন। এরপর সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করেন। ওই সময় শিশু রামিসার মা তার খোঁজ করতে করতে আসামির দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে সোহেল রানা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করেন।
হত্যাকাণ্ড পরবর্তী জবানবন্দিতে আসামি আরও জানান, মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে তিনি রামিসার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক কেটে ফেলেন। এরপর মরদেহটি বাথরুম থেকে এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন। অপরাধ সংঘটনের সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল রানা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। জবানবন্দিতে আসামি স্পষ্ট করেন যে, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না; কেবল মাদকাসক্ত অবস্থায় বিকৃত মানসিকতা থেকেই তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান।
ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে আসামির ঘরের দরজার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দাদের সহযোগিতায় দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন রামিসার বাবা-মা। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ এবং ঘরের ভেতর একটি বড় বালতিতে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।
খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আসামি স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গত বুধবার আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
এদিকে, এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, শিশু রামিসা হত্যা মামলার ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই রিপোর্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির আগেই আদালতে মামলার চার্জশিট দাখিল করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুততম সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।