আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে অতিরিক্ত ভিড় ও অনভিজ্ঞ আরোহীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি বসন্তকালীন মৌসুমে রেকর্ডসংখ্যক আরোহনের মধ্যেই চূড়া থেকে নামার পথে দুই ভারতীয় পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে। অভিজ্ঞ শেরপারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন ভিড় এবং নিয়মনীতির শিথিলতা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। হিমালয়ের এই চূড়ায় এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত দুই ভারতীয় ও তিন নেপালীসহ অন্তত পাঁচজন আরোহীর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নেপালের পর্যটন বিভাগ ও স্থানীয় অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নিহত দুই ভারতীয় পর্বতারোহী হলেন সন্দীপ আরে এবং অরুণ কুমার তিওয়ারি। অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পাইওনিয়ার অ্যাডভেঞ্চার্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্দীপ আরে ২০ মে এবং অরুণ কুমার তিওয়ারি ২১ মে সফলভাবে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। তবে চূড়া থেকে নিচে নেমে আসার সময় চরম উচ্চতাজনিত শারীরিক জটিলতা বা ‘অলটিচিউড সিকনেস’-এ আক্রান্ত হয়ে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মারা যান। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে বর্তমানে তাদের মরদেহ উচ্চাঞ্চল থেকে নিচে নামিয়ে আনার উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর বাইরেও চলতি মাসের শুরুতে নেপালের মাকালু পর্বতে এক মার্কিন এবং এক চেক আরোহীর মৃত্যু হয়েছে, যা সামগ্রিক পর্বতারোহণ ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
চলতি মাসেই এভারেস্টে রেকর্ড ৩২তম বারের মতো আরোহনের অনন্য কৃতিত্ব গড়া নেপালি পর্বতারোহী কামি রিতা শেরপা কাঠমান্ডুতে ফিরে এসে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ‘এভারেস্ট ম্যান’ হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তি আরোহী জানান, এবারের অভিযানগুলো ছিল অতিরিক্ত ভিড়ে ঠাসা, যা আরোহীদের জীবনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, বরফাচ্ছন্ন ও তীব্র অক্সিজেনস্বল্পতার ‘ডেথ জোন’ নামক উচ্চাঞ্চলে নির্দিষ্ট রশি ধরে শত শত আরোহী দীর্ঘ সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। কামি রিতা শেরপা নেপাল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল দক্ষ, শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য পর্বতারোহীদেরই এভারেস্টের অনুমতি দেওয়া উচিত এবং প্রতি বছর পারমিট ইস্যুর একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
পর্যটন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্যমতে, সম্প্রতি নেপালের দক্ষিণ দিক দিয়ে একদিনেই রেকর্ড ২৭৫ জন আরোহী ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট চূড়ায় আরোহণ করেছেন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, এর আগে ২০১৯ সালের মে মাসে একদিনে সর্বোচ্চ ৩৫৪ জন আরোহী এভারেস্ট জয় করেছিলেন। সাধারণত এভারেস্টে আরোহনের দুটি প্রধান রুট রয়েছে, যার একটি নেপালের দক্ষিণ দিক এবং অন্যটি তিব্বতের উত্তর দিক। তবে চলতি বছর চীন সরকার তিব্বত অংশের পথ বন্ধ রাখায় বিশ্বের সব প্রান্তের আরোহীদের বাধ্য হয়ে নেপালের রুটটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে নেপালের দক্ষিণ দিকের সংকীর্ণ ট্র্যাকে আরোহীদের অভূতপূর্ব চাপ তৈরি হয়েছে। এর মাঝেই ব্রিটিশ পর্বতারোহী ও গাইড কেন্টন কুল ২০তম বারের মতো এভারেস্ট জয় করে নেপালি ভিন্ন অন্য কোনো দেশের নাগরিক হিসেবে সর্বোচ্চ আরোহনের নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভারেস্টে আরোহনের জন্য মে মাসের আবহাওয়া সবচেয়ে অনুকূল থাকে, তবে তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্থায়ী হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব আরোহী একসাথে চূড়ার দিকে অগ্রসর হওয়ায় সংকীর্ণ ট্র্যাকে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। চলতি মৌসুমে নেপাল সরকার বিদেশি আরোহীদের জন্য রেকর্ড ৪৯২টি পারমিট ইস্যু করেছে। প্রতিটি বিদেশি পারমিটের সাথে অন্তত একজন স্থানীয় গাইড যুক্ত থাকায় এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে ও চূড়ার পথে প্রায় এক হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কোনো জরুরি মুহূর্তে উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনেও বড় ধরনের জীবনহানির আশঙ্কা থাকে। বৈশ্বিক পর্বত পর্যটনে নেপালের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও, আরোহীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই পারমিট নীতি পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ বিশেষজ্ঞরা।