সারাদেশ ডেস্ক
ঝিনাইদহ শহরের পুরাতন ডিসি কোর্ট এলাকায় একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর এই হামলার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগদান কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি ঝিনাইদহ সফরে এসেছিলেন। এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে নানামুখী আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পূর্বে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঝিনাইদহ শহরে পৌঁছান এবং জেলা কালেক্টরেট মসজিদে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ তার সাথে কথা বলতে এগিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কথোপকথনের একপর্যায়ে পেছন থেকে একদল যুবক আকস্মিকভাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা চালায়। এ সময় বাধা দিতে গেলে এনসিপির কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মী আহত হন। ঘটনার আকস্মিকতায় সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় ওই এলাকায় এনসিপি নেতা তারেক রেজার কিছু সহযোগী এবং সীমিত সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন, ঝিনাইদহ-২ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আজম মোঃ আবু বকর কিংবা ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে উদ্ধারে তাৎক্ষণিক কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রশিবিরের কিছু কর্মীকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সাথে দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
হামলার শিকার হওয়ার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং ঘটনাটিকে আইনমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ তথ্যগত ভুল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ঝিনাইদহ সদর আসনটি কোনোভাবেই বর্তমান আইনমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা নয়। আইনমন্ত্রী মূলত ঝিনাইদহের শৈলকূপা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা জেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেতাদের এলাকা সংক্রান্ত তথ্যের এমন বিভ্রান্তি মাঠপর্যায়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে পারে।
ঝিনাইদহের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। জেলার মোট ৪টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৩টি আসনেই বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিরা জয়ী হয়েছেন। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে কৌশলগত ও আদর্শিক কিছু মতপার্থক্য থাকলেও ঝিনাইদহে দল দুটির মধ্যকার সম্পর্ক এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং সংঘাতমুক্ত রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের ধারণা, একটি শান্ত ও স্থিতিশীল জেলাকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে কিংবা বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কৃত্রিম দূরত্ব ও সংঘর্ষের আবহ তৈরি করতেই এই ধরনের আকস্মিক সফরের আয়োজন করা হয়ে থাকতে পারে।
দেশের বর্তমান গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং তা নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিতর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তারা মনে করছেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহনশীলতা ও তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। যেকোনো ধরনের মিথ্যাচার, চরিত্রহনন, কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা সাংঘর্ষিক রাজনীতি কোনো দলের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণ বয়ে আনবে না। একই সাথে, কোনো উসকানিমূলক ফাঁদে পা না দিয়ে জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সকল রাজনৈতিক অংশীজনকে আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।