আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবরুদ্ধ অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্ত করার বিনিময়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসন ও ভূরাজনৈতিক সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল জরুরি ভিত্তিতে তেহরানে পৌঁছেছে। এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা, যা পরবর্তীতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও ফলপ্রসূ সংলাপের পথ সুগম করবে।
দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান এই সংকটে ওমান এবং সম্প্রতি পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ কাতার এবার সরাসরি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরেরও তেহরান সফরের কথা রয়েছে। অবশ্য আলোচনার গতিপ্রকৃতি ও বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে ইরান আপাতত কিছুটা সতর্ক ও মৃদু অবস্থান বজায় রেখেছে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ইরান সম্প্রতি ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) নামে একটি বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নির্দিষ্ট টোল বা শুল্ক আরোপ করা এবং নিজস্ব সমুদ্রপথ ব্যবহারে বাধ্য করা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে কোনো ধরনের একক নিয়ন্ত্রণ বা শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া ওয়াশিংটন কোনোভাবেই মেনে নেবে না। সুইডেনে ন্যাটোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, ইরান বিশ্বজুড়ে একটি অবৈধ টোল ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে, যা কোনো দেশেরই সমর্থন করা উচিত নয়। পাশাপাশি, সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রণালির যৌথ নিয়ন্ত্রণের একটি বিকল্প খসড়া পরিকল্পনা উত্থাপন করেছে পাকিস্তান।
এদিকে ইরানের এই নতুন টোল নীতি ও কৌশলগত অবস্থানের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই পাঁচ দেশ যৌথভাবে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল তদারকি সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অথরিটি’র কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানের পিজিএসএ-এর সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই দেশগুলোর মতে, ইরানের প্রস্তাবিত বিকল্প রুট এবং টোল নীতিকে স্বীকৃতি দেওয়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে, যা মূলত আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ মন্তব্য করেছেন যে, ইরান আলোচনার টেবিলে নিজেদের সুবিধা বাড়াতে নিজেদের সক্ষমতাকে অতিরিক্ত বড় করে দেখাচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক এই জটিল সমীকরণে পাকিস্তান যেকোনো সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক চুক্তির জামিনদার হিসেবে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী মহসেন নকভি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। অপরদিকে, ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত জটিলতা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্থায়ীভাবে শত্রুতা অবসানের দাবি জানিয়েছে। তেহরানের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ধাপে ধাপে সকল মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে মার্কিন-ইসরাইলি অক্ষ থেকে কোনো প্রকার সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করার আইনি প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করা।
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈশ্বিক তেলের বাজারের স্থিতিশীলতাও এই আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মহল থেকে ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে উঠে এলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল হিসেবেই ওয়াশিংটন আলোচনার বিষয়ে বহুমুখী অবস্থান প্রদর্শন করছে। অপরদিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস বা অন্য দেশে হস্তান্তর নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের নানা জল্পনা থাকলেও, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একে ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তেহরানের বর্তমান মূল লক্ষ্য হলো লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে চলমান সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।