আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে জাতীয় পর্যায়ে ‘অতি উচ্চ’ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির মহাপরিচালক সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভাইরাসের সর্বশেষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এই সতর্কবার্তা দেন। একই সঙ্গে ভাইরাসটি কঙ্গোর সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায়ও ছড়িয়ে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। এবারের প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার ‘বুন্ডিবুগিও’ স্ট্রেন বা ধরন দ্বারা সংক্রমিত হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে, কারণ এই নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো প্রতিষেধক টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গো এবং উগান্ডায় এ পর্যন্ত ৮২ জনের শরীরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ইতিমধ্যে সাতজন মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি আরও জটিল ও আশঙ্কাজনক বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বর্তমানে ওই অঞ্চলে প্রায় ৭৫০টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং আরও ১৭৭টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা ভাইরাসটির দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়। আক্রান্ত এবং মৃতদের বড় অংশই প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তৈরিতে বেগ পেতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানান, নতুন মূল্যায়নে দেখা গেছে কঙ্গোর অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় পর্যায়ে সংক্রমণের ঝুঁকি এখন ‘অতি উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং সীমান্ত পারাপারের কারণে আঞ্চলিক পর্যায়ে এই ঝুঁকি ‘উচ্চ’ মাত্রার হলেও, দূরবর্তী দেশগুলোতে ছড়ানোর সম্ভাবনা কম থাকায় বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকি এখনও ‘নিম্ন’ মাত্রায় রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে আঞ্চলিক স্তরে সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ইবোলা একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী ভাইরাস, যা বন্যপ্রাণী (যেমন ফলখেকো বাদুড়) থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায় এবং পরবর্তীতে মানবদেহের রক্ত ও তরল পদার্থের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমিত হয়। সাধারণত ইবোলার ‘জাইর’ (Zaire) স্ট্রেনের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা থাকলেও, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ‘বুন্ডিবুগিও’ (Bundibugyo) স্ট্রেন। এই সুনির্দিষ্ট ধরনের কোনো অনুমোদিত প্রতিষেধক না থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে আক্রান্ত রোগীদের কেবলমাত্র লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা (সিম্পটোমেটিক কেয়ার) এবং তরল পুনর্স্থাপন (রিহাইড্রেশন) থেরাপি দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ভাইরাসটির আঞ্চলিক বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো কঙ্গো ও উগান্ডা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসাদের খুঁজে বের করা) এবং নিরাপদ দাফন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আফ্রিকার এই অঞ্চলে স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় এবং চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবিলম্বে আক্রান্ত দেশগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।