আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জের ধরে ভারতে চলতি মাসে তৃতীয়বারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শনিবার (২৩ মে) থেকে সারা দেশে জ্বালানি তেলের এই নতুন বর্ধিত মূল্য কার্যকর করা হয়েছে বলে ভারতের খুচরা বিক্রেতা ও তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৮৭ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৫১ রুপিতে। একই সাথে প্রতি লিটার ডিজেলে ৯১ পয়সা বাড়িয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯২ দশমিক ৪৯ রুপি। দেশটির অন্যান্য রাজ্য ও বড় শহরগুলোতেও স্থানীয় করের তারতম্যের ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের দাম আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মে মাসে মাত্র তিন দফার মূল্যবৃদ্ধিতে ভারতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি মোটের ওপর প্রায় ৫ রুপি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেল। এর আগে গত ১৫ মে দীর্ঘ চার বছর পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এবং ব্যবহারকারী দেশ। দেশটির মোট চাহিদার সিংহভাগ জ্বালানি তেলই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ব্যাপক মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ভারতই তুলনামূলক দীর্ঘ সময় অভ্যন্তরীণ বাজারে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল। তবে বিশ্ববাজারের চাপ দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো একবারে বড় অঙ্কের দাম না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে খুচরা মূল্য বৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করেছে। এর আগে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে উত্তর প্রদেশসহ দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঠিক একইভাবে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় তেলের দাম বাড়িয়েছিল কোম্পানিগুলো। তবে এই দফায় ধারাবাহিকভাবে মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন খরচ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
এদিকে জ্বালানি তেলের এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির প্রধান বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সম্প্রতি শেষ হওয়া কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এবং রাজনৈতিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এতদিন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে তেলের দাম বাড়াতে দেয়নি। নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এই বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিরোধীরা দাবি করছে।
তবে তেল বিপণন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান চড়া মূল্যের তুলনায় এই মূল্যবৃদ্ধি একেবারেই সামান্য। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভারত পেট্রোলিয়াম’-এর শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, খুচরা পর্যায়ে বর্তমান বর্ধিত মূল্যের পরও সংস্থাগুলোকে প্রতি লিটার ডিজেলে ২৫ থেকে ৩০ রুপি এবং প্রতি লিটার পেট্রোলে ১০ থেকে ১৪ রুপি পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি বা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে অভ্যন্তরীণ মূল্যের সামঞ্জস্য না এলে এই লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় তেল মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দেশের তেল শোধনাগারগুলোকে সচল রাখা কিংবা লোকসান কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। ফলে তেল কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজার দরের সাথে সমন্বয় করে চলতে হবে। উল্লেখ্য, ভারত পেট্রোলিয়াম, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম— এই তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই যৌথভাবে ভারতের ১ লাখ ৩ হাজার জ্বালানি স্টেশনের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সাধারণত বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগেই অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম নির্ধারণ ও কার্যকর করে থাকে।