প্রযুক্তি প্রতিবেদক
আগামী জুন মাসে উত্তর আমেরিকায় শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে দলগুলোর রণকৌশল সাজাতে এবং মাঠের পারফরম্যান্সের চুলচেরা বিশ্লেষণে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তি। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা উন্নতমানের ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। এর ফলে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের কোচ এবং ফুটবলাররা ম্যাচ চলাকালীন ও ম্যাচ পরবর্তী সময়ে রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক প্রযুক্তিগত সুবিধা পাবেন। আধুনিক এই প্রযুক্তির সংযোজন বৈশ্বিক ফুটবল টুর্নামেন্টের ইতিহাসে কৌশলগত পরিকল্পনায় এক বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত ‘ফুটবল এআই প্রো সিস্টেম’ নামের এই আধুনিক প্রযুক্তিটি ফিফার শত কোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি ফুটবল সংক্রান্ত ২ হাজারেরও বেশি জটিল মেট্রিক্স অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রক্রিয়া করতে পারবে। মাঠের ফুটবলারদের প্রেসিং, মুভমেন্ট, দলীয় কৌশল এবং ট্রানজিশনের (আক্রমণ থেকে রক্ষণ বা রক্ষণ থেকে আক্রমণ) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই এআই মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের শক্তির জায়গা এবং দুর্বলতা মূল্যায়নের জন্য থাকবে আলাদা এআই মডেল। দলের সঙ্গে থাকা ভিডিও বিশ্লেষকরা ভিডিও ক্লিপ এবং থ্রিডি অ্যাভাটারের (ডিজিটাল প্রতিরূপ) সাহায্যে নিজেদের এবং প্রতিপক্ষ দলের খেলার ধরন সরাসরি তুলনা করার সুযোগ পাবেন।
এই প্রযুক্তির সাহায্যে দলগুলোর কোচ ও টেকনিক্যাল স্টাফরা মাঠে নামার আগেই দেখতে পাবেন যে তাদের গৃহীত কৌশলগত পরিবর্তনগুলো আসন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে, খেলোয়াড়রাও মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতকৃত বা পার্সোনালাইজড ম্যাচ বিশ্লেষণ রিপোর্ট পাবেন। নিজের পজিশন, পাসিং অ্যাকুরেসি এবং ট্যাকলিংয়ের ডিজিটাল ডেটা হাতে পাওয়ায় খেলোয়াড়রা মাঠে নিজেদের আরও ভালোভাবে উপস্থাপনের বাড়তি সুবিধা পাবেন। জটিল এই সিস্টেমটি তার চূড়ান্ত ফলাফল কেবল জটিল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে টেক্সট ব্যাখ্যা, গ্রাফিকাল চার্ট এবং সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপের আকারে উপস্থাপন করবে, যা সাধারণ ফুটবলারদের বোঝার জন্য অত্যন্ত সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক গবেষণা সংস্থা ‘ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চ’-এর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে ফুটবল বিশ্বে কেবল সম্পদশালী বা ধনী দলগুলোই বিপুল অর্থ খরচ করে উচ্চমানের ডেটা বিশ্লেষক প্যানেল বা প্রযুক্তি ব্যবহারের একচেটিয়া সুবিধা পেত। এর ফলে বড় দলগুলোর বিপরীতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা কম বাজেটের দলগুলো কৌশলগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকত। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে উন্নত এআই প্রযুক্তির সার্বিক অন্তর্ভুক্তি সেই প্রযুক্তিগত বৈষম্যকে অনেকটাই দূর করে দেবে। মাঠের লড়াইয়ে সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ক্রীড়া ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
যৌথভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার মোট ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল এই আসরে অংশ নিচ্ছে এবং মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নিখুঁত ডেটা সংগ্রহের জন্য স্টেডিয়ামগুলোতে হাই-টেক ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের মাত্র এক সেকেন্ডে ডিজিটাল স্ক্যান করে তাদের নিখুঁত থ্রিডি ভার্সন বা ত্রিমাত্রিক রূপ তৈরি করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে এই থ্রিডি অ্যানিমেশনগুলো কোচদের নিখুঁতভাবে কৌশল বিশ্লেষণে এবং অফসাইড বা ফাউলের মতো জটিল পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নে রেফারিদেরও পরোক্ষ সহায়তা দিতে পারবে। মাঠের ফুটবলে প্রযুক্তির এমন বহুমুখী ব্যবহার টুর্নামেন্টকে আরও বেশি আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত করে তুলবে।