বাংলাদেশ ডেস্ক
হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা মামলায় অভিযুক্ত দেশের ২৮২ জন সাংবাদিকের একটি তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছেন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। আজ রোববার (১৭ মে) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা দায়েরের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলে, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন।
বৈঠক শেষে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। হস্তান্তরিত তালিকা অনুযায়ী, মোট ২৮২ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯৪ জনের নাম রয়েছে বিভিন্ন হত্যা মামলায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ সুরক্ষায় এই মামলাগুলোকে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন দেশের জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে সাংবাদিকদের এভাবে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর বলে তারা উল্লেখ করেন।
ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম ব্রিফিংয়ে বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর একটি প্রাথমিক ও আন্তরিক তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়েছে। এই তালিকাটি সম্পূর্ণ চূড়ান্ত নাও হতে পারে, তবে বিদ্যমান সংকট সমাধানে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ। তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আন্তরিকতার সঙ্গে এই আবেদন গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে তালিকাটি সুনির্দিষ্টভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সে ব্যাপারে সরকার একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের বলেন, সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ দেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সুরক্ষায় যে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বর্তমান সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো আইনি হয়রানি যাতে সাংবাদিকদের ওপর না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ করা হয়নি উল্লেখ করে সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ সরকারের এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানান এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এর আগে, রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দের এক মতবিনিময় সভা ও মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিপাক্ষিক এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। অন্যদিকে, দেশের সংবাদপত্রের নীতি-নির্ধারকদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ এবং দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বৈঠকে সার্বিক সহযোগিতা করেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হলে তা সামগ্রিক গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার শামিল হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে সম্পাদকদের এই আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং সুনির্দিষ্ট তালিকা হস্তান্তরকে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন সাংবাদিকদের অযাচিত আইনি হয়রানির অবসান ঘটবে, অন্যদিকে তেমনি দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ধরে রাখা সহজ হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই আইনি জটিলতার দ্রুত অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন দেশের সংবাদকর্মী ও সুশীল সমাজ।