আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে রাশিয়া বেলারুশকে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, মস্কো বেলারুশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল কিংবা ন্যাটোভুক্ত কোনো প্রতিবেশী দেশে নতুন করে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। গত শুক্রবার সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি এই আশঙ্কার কথা জানান।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের মতে, ক্রেমলিন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কোকে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, বেলারুশের দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে নতুন সামরিক অভিযানের ছক কষা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হতে পারে ইউক্রেনের চেরনিহিভ ও রাজধানী কিয়েভ অঞ্চল অথবা বেলারুশের সীমান্তে অবস্থিত ন্যাটোভুক্ত দেশ পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া। তবে এই সম্ভাব্য হামলার কৌশলগত বিবরণ বা সুনির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে বিবৃতিতে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ইউক্রেনের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়া কিংবা বেলারুশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কোকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার সময় মিনস্ক রাশিয়ার বাহিনীকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। তবে যুদ্ধের চার বছর পার হতে চললেও লুকাশেঙ্কো এখন পর্যন্ত বেলারুশের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীকে সরাসরি ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধ করতে পাঠাননি। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৌশলগত সহযোগিতার অংশ হিসেবে বেলারুশ তাদের মাটিতে রাশিয়ার ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে, যা এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষে কিয়েভ ও চেরনিহিভ অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং পাল্টা হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বেলারুশ প্রশাসন যদি রাশিয়ার চাপের মুখে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইউক্রেন নিজের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষায় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। এই ঘোষণা বেলারুশ সীমান্তে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে রণক্ষেত্রের অন্য প্রান্তে সহিংসতা ও পাল্টা আঘাতের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দারনিতস্কি এলাকার একটি নয়তলা আবাসিক ভবনে গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ২৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই নৃশংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল কিয়েভে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়। এই হামলার জবাবে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে কয়েকটি অঞ্চলের জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব এই পাল্টা হামলাকে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ ন্যায্য ও কৌশলগত প্রতিরোধ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেলারুশকে কেন্দ্র করে নতুন ফ্রন্ট খোলার এই প্রচেষ্টা চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং ন্যাটোর সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির কারণে বহুপাক্ষিক সংকটে রূপান্তর করতে পারে।