আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনের যৌথ উদ্যোগে উত্থাপিত নতুন খসড়া প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে চীন। বেইজিং এই প্রস্তাবের বিষয়বস্তু এবং সময় নির্বাচনকে ‘অনুপযুক্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে এ ধরনের কোনো একপেশে পদক্ষেপ সংকট সমাধানের পরিবর্তে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে চীন সতর্কবার্তা দিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদে এই খসড়া প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হলে তা পুনরায় চীন ও রাশিয়ার ভেটোর মুখে পড়তে পারে, যার ফলে প্রস্তাবটি পাসের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ফু চং এই খসড়া প্রস্তাবের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানান, প্রস্তাবটির মূল বক্তব্য এবং এটি উত্থাপনের সময়—কোনোটিই সঠিক নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের একপেশে অবস্থান বা জোরপূর্বক কোনো প্রস্তাব পাস করার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে। বেইজিংয়ের মতে, হরমুজ প্রণালির চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে উসকানি দেওয়া থেকে বিরত রাখা এবং তাদের আন্তরিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি করলে তা দীর্ঘমেয়াদি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া মার্কিন-বাহরাইন যৌথ খসড়া প্রস্তাবটিতে মূলত ইরানের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সামরিক হামলা বন্ধ, সমুদ্রপথে মাইন স্থাপন থেকে বিরত থাকা এবং নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার দাবি জানানো হয়েছে। তবে প্রস্তাবটির ভাষা ও উদ্দেশ্য নিয়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। চীন ও রাশিয়ার দাবি, এই খসড়া প্রস্তাবে সংকটের মূল কারণগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সমস্ত দায় এককভাবে ইরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা পরিষদের নিরপেক্ষ ভূমিকার পরিপন্থী।
এর আগে গত এপ্রিলেও হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে মার্কিন সমর্থনে বাহরাইনের পক্ষ থেকে একই ধরনের একটি খসড়া প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হয়েছিল। সে সময় ১৫ সদস্যবিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের ১১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করায় প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যায়। তৎকালীন ভেটো প্রদানের সপক্ষে দুই দেশই যুক্তি দিয়েছিল যে, প্রস্তাবের ভাষা অত্যন্ত একপেশে এবং তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্বার্থকে বৈধতা দেওয়ার একটি প্রয়াস মাত্র। গত মাসের সেই কূটনৈতিক অচলাবস্থার পর মে মাসে এসে আবারও প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটন ও মানামা সক্রিয় হওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরে পরাশক্তিগুলোর বিভক্তি নতুন করে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ হিসেবে বিবেচিত, যেখান দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের দাবি, ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি। অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কেবল নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে এবং সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা আবশ্যক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের নীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বেইজিং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো প্রকার সামরিক বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেয়ে সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতাই কেবল হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে অদূর ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির নৌ-নিরাপত্তা সংকটের কূটনৈতিক সমাধান কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।