বাণিজ্য প্রতিবেদক
দেশের ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্পের আধুনিকায়ন ও হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে চীনের উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বৃহস্পতিবার রাজধানীর পূর্বাচলে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে (বিবিসিএফইসি) দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-চীন গ্রিন টেক্সটাইল এক্সপো-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের সোনালী আঁশ বা পাটের কদর বেড়েছে। তবে এই শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। চীন যদি তাদের আধুনিক গ্রিন টেকনোলজি ও কারিগরি দক্ষতা আমাদের পাট খাতে বিনিময় করে, তবে দুই দেশই লাভবান হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (এসইজেড) বিনিয়োগের মাধ্যমে চীনা উদ্যোক্তারা যেমন শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন, তেমনি বাংলাদেশে বড় আকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই চীন শুধু পণ্য আমদানিকারক হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়নের অংশীদার হিসেবে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও পাট শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিস্তার আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। টেক্সটাইল খাতে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য রয়েছে এবং এই সাফল্যকে টেকসই করতে গ্রিন টেকনোলজি বা সবুজ প্রযুক্তি এখন সময়ের দাবি।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আরও জানান, চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। বিশেষ করে গ্রিন টেক্সটাইল এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় চীন সব ধরনের কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। তিনি আশ্বাস দেন যে, কেবল টেক্সটাইল নয়, বাংলাদেশের পাট শিল্পের আধুনিকায়নেও চীনা প্রযুক্তিবিদ ও বিনিয়োগকারীরা কাজ করতে আগ্রহী। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি নতুন নতুন বাণিজ্যিক দ্বার উন্মোচন করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা, বস্ত্র প্রকৌশলী এবং চীন থেকে আসা প্রতিনিধি দল অংশ নেন। বক্তারা বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের আধুনিকায়নে চীনের মেশিনারিজ ও কাঁচামাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এই গ্রিন টেক্সটাইল এক্সপোতে চীন ও বাংলাদেশের শতাধিক স্টল স্থান পেয়েছে। এখানে মূলত পরিবেশবান্ধব সুতা, ফেব্রিকস এবং আধুনিক টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে পাট ও বস্ত্র খাতে কারিগরি দক্ষতা বিনিময় বিষয়ক একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোকে আরও পরিবেশবান্ধব এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে।