আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ইরানের ওপর চীনের প্রভাব কাজে লাগাতে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে বেইজিংয়ের ভূমিকা এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন নিজেকে বৈশ্বিক শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তাতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ নিষ্পত্তি একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা নিরসনে বেইজিংয়ের সফল মধ্যস্থতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চীনের অবস্থানকে সুসংহত করেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা নিরসনেও বেইজিংয়ের সক্রিয়তা প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। বিশেষ করে ইরানের অর্থনীতির ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তেহরানকে যেকোনো সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে বেইজিংকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। বর্তমানে ইরানের উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই চীন রপ্তানি করে, যা তেহরানের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। ফলে বেইজিংয়ের নেওয়া যেকোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বেইজিং সফর তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি পুনর্নশ্চিত করেছে। এছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়েও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রাথমিক পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত রপ্তানি-নির্ভর চীনা অর্থনীতি বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বেইজিং নিজেও এই যুদ্ধের অবসান এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগ্রহী। ইরান থেকে তেল আমদানির বিষয়ে ওয়াশিংটনের ক্রমাগত চাপের মুখে বেইজিংকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে হচ্ছে।
তবে চীনের এই মধ্যস্থতার পথ খুব একটা সহজ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পের যেকোনো অনুরোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক কৌশল অবলম্বন করবেন। চীন দীর্ঘকাল ধরে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বিশ্বনেতা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে আসছে। সেক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা তাদের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের পরিপন্থী হতে পারে। বিশেষ করে এমন কোনো চুক্তিতে বেইজিং সমর্থন দেবে না যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্যকে আরও সুসংহত করার সুযোগ দেয়।
ব্রিকস (BRICS) জোটের সদস্য হিসেবে ইরান চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। আন্তর্জাতিক এই জোটে নিজেদের মিত্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে শি জিনপিং কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় বেইজিং হয়তো সরাসরি মধ্যস্থতার চেয়ে আন্তর্জাতিক নৌপথ বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার মতো সাধারণ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একমত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে বেইজিংয়ের প্রকৃত সক্রিয়তা কতটুকু হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে ট্রাম্প-শি শীর্ষ বৈঠকের ফলাফলের ওপর। এই সম্ভাব্য আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।