আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গোপন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফরের খবর নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার রাতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই সফরের তথ্য নিশ্চিত করে জানানো হয়েছে, এই সফর ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক সাফল্য বয়ে এনেছে। তবে এই দাবির পরক্ষণেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানা গেছে, গত ২৬ মার্চ ওমান সীমান্তের নিকটবর্তী মরুশহর আল আইনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। মূলত ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু নেতানিয়াহু নন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালক ডেভিড বার্নিয়া গত কয়েক মাসে অন্তত দুইবার ইউএই সফর করেছেন। মূলত ইরানের বিপক্ষে সামরিক পদক্ষেপ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সমন্বয় করতেই এই সফরগুলো অনুষ্ঠিত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এদিকে ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যকার এই সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির সাম্প্রতিক মন্তব্যে। তিনি জানিয়েছেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের উন্নত ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে সহায়তা করেছে। হাকাবির মতে, বর্তমানে দেশ দুটির মধ্যে এক অনন্য এবং নিবিড় সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানিয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেও গোপনে ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়েছে। গত এপ্রিলের শুরুতে ইরানের লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগারে হামলার পেছনে আমিরাতের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে, যা ছিল মূলত ইরানের আগের কোনো হামলার পাল্টা প্রতিশোধ।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রথম উপসাগরীয় দেশ হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান এই পথ অনুসরণ করলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সম্পর্ককে শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে। এই নিবিড় সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে সম্প্রতি আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—উভয় রাষ্ট্রই বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছে। গাজায় চলমান সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধেও সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধে বিতর্কিত আধাসামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’কে (আরএসএফ) অর্থ ও মারণাস্ত্র সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে। যদিও আমিরাত কর্তৃপক্ষ বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করতে মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই দেশ তাদের পুরনো বৈরিতা ভুলে একাট্টা হচ্ছে। তবে নেতানিয়াহুর এই গোপন সফর এবং আমিরাতের অস্বীকার করার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, কৌশলগতভাবে দেশ দুটি কাছাকাছি এলেও জনসমক্ষে বা মুসলিম বিশ্বের কাছে এই সম্পর্কের পূর্ণ প্রকাশ এখনও তাদের জন্য স্পর্শকাতর। এই ধরনের গোপন সামরিক সহযোগিতা আগামীতে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।