নিজস্ব প্রতিবেদক
বিগত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হত্যা মামলার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রধান উপদেষ্টার তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের কারো কারো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ধরন সাধারণ হত্যার চেয়েও গুরুতর হতে পারে, তবে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট যে অভিযোগে মামলা হয়েছে, তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনার অবকাশ রাখে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বর্তমান সরকারের কার্যক্রম ও সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এর প্রেক্ষাপট ও আইনি দিকগুলো ব্যাখ্যা করেন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে যারা কারান্তরীণ আছেন, তারা মূলত সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। তবে আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোকে কেবল হত্যাকাণ্ড হিসেবে না দেখে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে গুম ও জুলাই মাসে সংঘটিত সহিংসতাকে সুশৃঙ্খল অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মানদণ্ড অনুযায়ী এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ভুক্ত।
ডা. জাহেদ উর রহমান ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়াল কিংবা রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় কেবল সরাসরি অংশ গ্রহণকারীদেরই নয়, বরং যারা প্রোপাগান্ডা বা বয়ান তৈরির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন, তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জুলাই হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে যারা প্ররোচনা দিয়েছেন বা জনমতকে বিভ্রান্ত করে সহিংসতাকে সমর্থন করেছেন, তাদের দায়ভার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, যে অভিযোগে বর্তমানে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সেই অভিযোগের ধরন ও আইনি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) নেতৃবৃন্দ বিষয়টি নিয়ে সরকারপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সরকারপ্রধান সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। উপদেষ্টা জানান, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না, তবে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য উপদেষ্টার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে সরকার সাংবাদিকদের পেশাগত কারণে নয়, বরং নির্দিষ্ট অপরাধে সংশ্লিষ্টতার দায়ে বিচারের পক্ষপাতি। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অভিযোগ যেন না ওঠে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে থাকতে চায়। আগামী দিনগুলোতে এই মামলাগুলোর তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন প্রশাসনের লক্ষ্য।