সারাদেশ ডেস্ক
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসর রবীন্দ্র কাচারি বাড়িতে এক বর্ণাঢ্য আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে। শুক্রবার (৮ মে) দুপুরে জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে রবীন্দ্রনাথের অবদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, সাধারণ মানুষ সেই নতুন সরকারের প্রতি গভীর আস্থা ও প্রত্যাশা পোষণ করছে। বিগত সময়ের শাসনব্যবস্থায় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি গোষ্ঠী দেশব্যাপী অস্থিরতা সৃষ্টি করে এই অর্জনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে যেকোনো ধরনের নাশকতা বা গোলযোগ প্রতিরোধে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী প্রতিভা এবং মানবতার দর্শনের ওপর আলোকপাত করে মন্ত্রী বলেন, সাহিত্য, সংগীত ও নাটকের প্রতিটি শাখায় রবীন্দ্রনাথের বিচরণ বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেছে। কবির জীবন দর্শন ও সাহিত্য কেবল পাঠের বিষয় নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি উল্লেখ করেন, কবির ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ বিশ্ব সাহিত্যে বাঙালির জয়যাত্রা নিশ্চিত করেছিল। সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা সাহিত্য ও শিল্পের সান্নিধ্যে থাকে, তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটে যা একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে সহায়ক।
পতিসরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জমিদার হিসেবে নয়, বরং একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ এখানে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। এখানকার ভূমিহীন কৃষকদের দারিদ্র্য বিমোচন এবং মহাজনী শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। এমনকি কৃষিকে আধুনিকায়ন করার জন্য তিনি এখানে যান্ত্রিক চাষাবাদের সূচনা করেন। গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমবায় দর্শনের যে বীজ রবীন্দ্রনাথ পতিসরে বপন করেছিলেন, তা আজও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নের জন্য মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের যে স্বতন্ত্র পরিচয়, তা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র লাভ করেছি, তাকে সমুন্নত রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্য ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এবং সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু এবং নওগাঁর বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যবৃন্দ।
বক্তারা রবীন্দ্রনাথের পতিসরের স্মৃতি রক্ষায় গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন এবং এই পর্যটন কেন্দ্রটিকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার দাবি জানান। অনুষ্ঠানে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। পতিসরের রবীন্দ্র কাচারি বাড়িতে দিনব্যাপী এই আয়োজনে দূর-দূরান্ত থেকে আগত রবীন্দ্রপ্রেমীদের ঢল নামে, যা এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে।