বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সাহিত্য, সঙ্গীত বা শিল্পের সাধক ছিলেন না, বরং সমাজ, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত গভীর এবং দূরদর্শী। তিনি উল্লেখ করেন যে, একজন সৃজনশীল মানুষের পক্ষে চলমান রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গের মধ্যেও যে গভীর জীবনবোধ ও সমাজ সচেতনতা বজায় রাখা সম্ভব, রবীন্দ্রনাথ তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কবির জন্মবার্ষিকী স্মরণে একাডেমি বিশেষ এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী তার বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ও সামাজিক দূরদর্শিতার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক মনোজগৎ ছিল অত্যন্ত সতর্ক ও বিশ্লেষণধর্মী। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরবর্তী বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, যখন সারা বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক দর্শনে উদ্বেলিত ছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া সফর শেষে তার বিখ্যাত ‘রাশিয়ার চিঠি’তে সাম্যবাদের যান্ত্রিকতা ও মানুষের প্রকৃতির চিরায়ত গতির বিরোধের বিষয়টি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর মতো শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ওপরও কবির চিন্তার গভীর প্রভাব ছিল বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
বিজ্ঞানের সাথে সাহিত্যের মেলবন্ধন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সংলাপের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞানের অসীম অগ্রযাত্রার মধ্যেও এর বাইরের বিশাল জগৎ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে দার্শনিক ভাবনা ছিল, তা আজও গবেষকদের বিস্মিত করে। বর্তমান সময়ের অত্যাধুনিক টেলিস্কোপে মহাবিশ্বের যে অংশ দৃশ্যমান হচ্ছে, তার বাইরেও যে কোটি কোটি মহাবিশ্ব বিদ্যমান থাকতে পারে—সেই অজানার দিগন্ত সম্পর্কে কবি আইনস্টাইনকে ধারণা দিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, কবির কল্পনাশক্তি কেবল কাব্যিক ছিল না, বরং তা ছিল বৈজ্ঞানিক সত্যের অনুসন্ধানে এক অনন্য প্রয়াস।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও জীবনদর্শন বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের প্রধান শক্তি। আধুনিক বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিনির্মাণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনে রবীন্দ্র রচনাবলি এখনো অপরিহার্য। বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তার শিক্ষা ও দর্শন পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আলোচনার পর একাডেমির শিল্পীদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়, যেখানে কবির কালজয়ী গান ও কবিতার মাধ্যমে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।