বাংলাদেশ ডেস্ক
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সংগতি রেখে নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে সরকার। প্রস্তাবিত এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী সরাসরি উপকৃত হবেন। একইসঙ্গে পেনশনভোগীদের জন্যও এই স্কেলে বিশেষ আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পে স্কেল সংক্রান্ত পুনর্গঠিত কমিটি বর্তমানে সুপারিশ তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুতই তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির রূপরেখা অনুযায়ী, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনা করে আগামী তিন বছরে ধাপে ধাপে এই নতুন পে স্কেল কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতনের একটি বড় অংশ কার্যকর করার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে অতিরিক্ত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ করতে পারে অর্থ বিভাগ। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত নতুন স্কেলের প্রায় ৩৩ শতাংশ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন এই বেতন কাঠামোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পেনশনভোগীদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেনশনভোগীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যারা মাসিক ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে পেনশনের পরিমাণ প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে যারা ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার উপরে পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বাড়ানোর সুপারিশ রাখা হয়েছে।
আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা ভাতাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে বয়সের ভিত্তিতে চিকিৎসা ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার সংস্থান রাখা হয়েছে। মূলত বয়োবৃদ্ধ সাবেক সরকারি কর্মচারীদের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করতেই এই স্তরীভূত চিকিৎসা ভাতার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের এই উদ্যোগ সরকারি কর্মচারীদের কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহনে সহায়ক হবে। তবে বিশাল এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সংস্থান করতে গিয়ে জাতীয় বাজেটে যেন চাপ সৃষ্টি না হয়, সেজন্যই সরকার ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির মাধ্যমে এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা শুরু হতে পারে। পে স্কেল পুনর্গঠিত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে।
উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও কর্মচারী পর্যায় থেকে নতুন পে স্কেল ঘোষণার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। সরকারের এই সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই দীর্ঘদিনের দাবিরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত কর্মরত সকল পর্যায়ের সরকারি জনবলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে অর্থ বিভাগ।