নিজস্ব প্রতিবেদক
খুলনা বিভাগে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়া জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিভাগের ১০টি জেলায় নতুন করে আরও ১১৫ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত দেড় মাসে বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৮০০ জনে।
মঙ্গলবার (৫ মে) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ থেকে চলতি বছরের ৫ মে বিকেল পর্যন্ত বিভাগের জেলাগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ হাজার ৭৭৬ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৯৬ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই সময়ের মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে মোট ১৪ জন শিশু। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. মুজিবর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খুলনা বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কুষ্টিয়া জেলা। সেখানে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩১ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সংক্রমণ বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। কুষ্টিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য জেলাগুলোতেও আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যশোরে ৩৬৭ জন, মাগুরায় ৩৪০ জন এবং খুলনায় ৩২৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া মেহেরপুরে ১৬০, ঝিনাইদহে ১৫৬, নড়াইলে ১২৩, সাতক্ষীরায় ১২২, চুয়াডাঙ্গায় ৭৯ এবং বাগেরহাটে ৭৩ জন শিশু এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ যা মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত অন্য শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত আক্রান্তের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর, কাশির সঙ্গে শরীরের চামড়ায় লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। জটিল আকার ধারণ করলে এটি নিউমোনিয়া, মস্তিস্কের প্রদাহ বা ডায়রিয়ার মতো প্রাণঘাতী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যেসব শিশুর পুষ্টিহীনতা রয়েছে বা যারা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্ত নয়, তাদের ক্ষেত্রে ঝুকি অনেক বেশি।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে যে ১১৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে, তার মধ্যেও সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্ত কুষ্টিয়ায়। জেলাটিতে গত একদিনে নতুন করে ৪৭ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া যশোরে ১৮ জন, মাগুরায় ১২ জন, খুলনায় ১০ জন এবং ঝিনাইদহে ৯ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। নড়াইলে ৮ জন, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে ৪ জন করে এবং বাগেরহাটে ২ জন ও সাতক্ষীরায় ১ জন শিশুকে নতুন করে ভর্তি করা হয়েছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার চেষ্টা চলছে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের হামের টিকা সময়মতো নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জেলা হাসপাতালগুলোতে সরবারহ করা হচ্ছে বলে বিভাগীয় প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে।