অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
রংপুরের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘হাঁড়িভাঙ্গা’ আম এখন পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষায়। অনুকূল আবহাওয়া এবং চাষিদের নিবিড় পরিচর্যায় চলতি মৌসুমে এই বিশেষ জাতের আমকে কেন্দ্র করে রংপুর অঞ্চলে ২৫০ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এই আম স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতেই চাষ হয়েছে হাঁড়িভাঙ্গা। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন ধরা হলে এবার সামগ্রিক উৎপাদন গত বছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, আমের ফলন চক্রে এক বছর ফলন কম ও পরের বছর বেশি হয়। গত বছর ফলন কিছুটা কম থাকলেও এবার ‘অন ইয়ার’ হওয়ায় প্রতিটি গাছে প্রচুর আম ধরেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড় ও সামান্য শিলাবৃষ্টিতে কিছু এলাকায় আমের আংশিক ক্ষতি হলেও সামগ্রিক উৎপাদনে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বরং মে মাসের বৃষ্টি আমের আকার বৃদ্ধি এবং রসালো ভাব তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে যাতে শেষ মুহূর্তে পোকা বা ছত্রাকের আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। এর ফলে আমের গুণমান ও মিষ্টতা অক্ষুণ্ণ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঐতিহ্যগতভাবে জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিপক্ব হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারে মিলতে শুরু করে। তবে বাজারে অধিক মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অপরিপক্ব আম বিক্রি করার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগে আম না পাড়ার জন্য চাষিদের প্রতি কঠোর আহ্বান জানানো হয়েছে। মূলত জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এই আমের প্রকৃত স্বাদ, ঘ্রাণ ও মিষ্টতা পূর্ণতা পায়।
হাঁড়িভাঙ্গা আমের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পূর্ণ আঁশবিহীন এবং অত্যন্ত মিষ্টি। এই আমের আঁটি ছোট এবং চামড়াও বেশ পাতলা হয়। একেকটি আমের ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি এই আম রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর ব্র্যান্ড ভ্যালু কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর বিপণন সম্ভাবনা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে এই আমের মৌলিকত্ব নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকবে না, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বাণিজ্যিক প্রসারের বিষয়ে স্থানীয় আমচাষি ও উদ্যোক্তারা জানান, ইতোমধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বাগান মালিকদের সাথে আগাম যোগাযোগ শুরু করেছেন। এছাড়া গত কয়েক বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবাদে ফেসবুক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও এই আম রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেক রপ্তানিকারক। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং চাষিরা সরাসরি লাভবান হবেন।
তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিপরীতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পচনশীল পণ্য হওয়ার কারণে হাঁড়িভাঙ্গা আম দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত হিমাগার নেই। ফলে বাজারে একযোগে আম ওঠার পর দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে চাষিরা অনেক সময় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। দ্রুত পরিবহনের জন্য বিশেষ কার্গো ট্রেন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ব্যবস্থা করা এবং আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাতের আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বিপণন ব্যবস্থা সুসংগত হলে চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙ্গা আম অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র আমূল বদলে দেবে। কৃষি বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সব ঠিক থাকলে জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে চাষিরা আম সংগ্রহ শুরু করবেন এবং জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত এই বৃহৎ বাণিজ্য উৎসব চলবে। মূলত এই আম ঘিরেই এখন আবর্তিত হচ্ছে উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।