নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষকের সঙ্গে উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতির অশোভন আচরণের যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সুপ্রিম জুডিশিয়ারি কাউন্সিলের বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বিচারবিভাগের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তে সরকারের বা আইন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
শনিবার (২ মে) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের কার্যকর উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আইনমন্ত্রী বলেন, “কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে যদি অসদাচরণের (মিসকন্ডাক্ট) অভিযোগ ওঠে, তবে সেটি সুপ্রিম জুডিশিয়ারি কাউন্সিল দেখবে। এটি সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোর আওতাভুক্ত। এখানে আইন মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো ধরনের কর্তব্য, দায়িত্ব কিংবা সম্পৃক্ততা নেই।”
ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, সম্প্রতি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে একজন শিক্ষকের ‘অপ্রীতিকর’ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জটিলতার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই শিক্ষার্থীর বাবা হাইকোর্টের একজন বিচারপতি হওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে নিজ বাসভবনে ডেকে নিয়ে নাজেহাল করেন। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ বা শৃঙ্খলাজনিত বিধানগুলো সুনির্দিষ্ট। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়ারি কাউন্সিল মূলত প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তী দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হয়। কোনো বিচারকের শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্য অথবা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে এই কাউন্সিল তা তদন্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠায়। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন অভিভাবক হিসেবে বিচারপতির ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগটি নাগরিক সমাজে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে উচ্চ আদালতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এদিন অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে আইনি দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে গবেষণালব্ধ সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং ট্রাইব্যুনালগুলোর অবকাঠামোগত ও পদ্ধতিগত উন্নয়নে কাজ চলছে। অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিগণ এবং ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে দিনভর গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রীর দেওয়া এই নীতিগত ব্যাখ্যা।