ক্রীড়া প্রতিবেদক
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট মাকালুর (৮ হাজার ৪৮৫ মিটার) শিখরে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সফলভাবে আরোহণ করেছেন পর্বতারোহী বাবর আলী। শনিবার (২ মে) ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি শিখরে পৌঁছান বলে অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ অর্জনের মাধ্যমে তিনি তার ক্যারিয়ারের পঞ্চম আট হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত জয় সম্পন্ন করলেন।
পৃথিবীতে আট হাজার মিটার বা ততোধিক উচ্চতার মোট ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে। এর মধ্যে মাকালু শিখর বাংলাদেশী কোনো পর্বতারোহীর জন্য এবারই প্রথম সফলভাবে স্পর্শ করা সম্ভব হলো। বাবর আলীর এই অর্জন দেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে নতুন সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, “এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার” শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজক ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। অভিযানে বাবর আলীর সঙ্গে শীর্ষে পৌঁছান শেরপা গাইড আং কামি শেরপা। পর্বত অভিযানের ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিল নেপালের একটি আউটফিটার সংস্থা।
অভিযানের সময়সূচি অনুযায়ী, বাবর আলী ৭ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে ৯ এপ্রিল তিনি টুমলিংটার হয়ে সেদুয়া গ্রামে পৌঁছান এবং সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বেসক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তিনি ১৮ এপ্রিল উচ্চতর বেসক্যাম্পে পৌঁছান।
পর্বতের উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তিনি ধাপে ধাপে ক্যাম্প-১ ও ক্যাম্প-২ এ অবস্থান করেন। ২১ এপ্রিল ক্যাম্প-১ এবং পরদিন ক্যাম্প-২ এ রাতযাপন শেষে তিনি প্রায় ৭ হাজার মিটার উচ্চতা স্পর্শ করে পুনরায় বেসক্যাম্পে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল আবারও তিনি ক্যাম্প-২ এ অবস্থান করেন এবং পরদিন বেসক্যাম্পে নেমে আসেন। এরপর কয়েকদিন তিনি আবহাওয়া অনুকূল হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।
৩০ এপ্রিল আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতির সুযোগ নিয়ে তিনি পুনরায় উচ্চ পর্বতারোহণ শুরু করেন। সেদিন তিনি সরাসরি ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২ এ পৌঁছান এবং পরদিন ক্যাম্প-৩ (৭ হাজার ৪০০ মিটার) পর্যন্ত অগ্রসর হন। সেখান থেকে বিশ্রামের পর মধ্যরাতে শিখরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আরোহনের পর তিনি ভোরে মাউন্ট মাকালুর শিখরে পৌঁছান।
অভিযান ব্যবস্থাপকদের তথ্য অনুযায়ী, শিখর স্পর্শের পর বাবর আলী নিরাপদে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং ধাপে ধাপে ক্যাম্প-২ হয়ে বেসক্যাম্পে ফিরে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে আগামী দিনে তার বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বাবর আলীর পর্বতারোহণ যাত্রা শুরু হয় ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে, ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে ২০১৪ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে হিমালয় অভিযানে যুক্ত হন। তিনি চট্টগ্রামভিত্তিক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৭ সালে ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তার পেশাদার পর্বতারোহণ যাত্রা আরও গতি পায়। ২০২২ সালে তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন আমা দাবলাম শৃঙ্গ (৬ হাজার ৮১২ মিটার) জয় করেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮ হাজার ৮৪৮ মিটার) এবং একই অভিযানে চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ লোৎসে (৮ হাজার ৫১৬ মিটার) আরোহণ করেন। একই অভিযানে দুটি আট হাজার মিটার পর্বত জয় বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে প্রথম ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
২০২৫ সালে তিনি অন্নপূর্ণা-১ এবং মাউন্ট মানাসলু শৃঙ্গেও সফল আরোহণ সম্পন্ন করেন। এর মধ্যে মানাসলু অভিযানে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই শিখর স্পর্শ করেন, যা দেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাকালু শিখর জয় বাবর আলীর জন্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের উচ্চপর্বতারোহণ সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আট হাজার মিটার উচ্চতার পাঁচটি শৃঙ্গ জয় করার মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছেন।