নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা দমনে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একইসঙ্গে মহানগরীর চাঁদাবাজি বন্ধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বড় একটি অংশ বর্তমানে নিষ্ক্রিয় এবং যারা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে তাদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
শনিবার (২ মে) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি নতুন পুলিশ ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার এসব কথা জানান। সম্প্রতি মোহাম্মদপুর ও নিউ মার্কেট কেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং গত ২৮ এপ্রিল রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশের পক্ষ থেকে এই অবস্থান পরিষ্কার করা হলো। উল্লেখ্য, নিহত টিটন ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন ছিলেন এবং তিনি দীর্ঘ সময় বিদেশে পলাতক থাকার পর দেশে ফিরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কমিশনার বলেন, এক সময়কার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রভাব এখন আর আগের মতো নেই। বর্তমানে যারা অপরাধ জগতে নাম ভেজানোর চেষ্টা করছে, তারা মূলত পুরনো সন্ত্রাসীদের অনুসারী বা তাদের নাম ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও অন্যান্য ইউনিট নিয়মিত তালিকা হালনাগাদ করছে এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
রাজধানীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে অপরাধের হার ‘শূন্যে’ নামিয়ে আনতে নবপ্রতিষ্ঠিত পুলিশ ক্যাম্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ক্যাম্পে ২০ জন পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো প্রকার ভয়-ভীতি বা চাঁদাবাজির শিকার না হন, সেজন্য ক্যাম্পটি গোপনে ও প্রকাশ্যে অভিযোগ গ্রহণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। কমিশনার জানান, পরিবহন খাত, কাঁচাবাজার ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে চাঁদাবাজির চাপ কমাতে পারলে তার ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি দ্রব্যমূল্যের ওপর পড়বে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।
পুলিশের সেবার মান ও মামলা গ্রহণে অনীহা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার স্পষ্ট জানান, থানায় মামলা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। যদি কোনো ক্ষেত্রে থানা মামলা নিতে গড়িমসি করে, তবে ভুক্তভোগীদের সংশ্লিষ্ট জোনাল এসি (সহকারী কমিশনার) অথবা ক্রাইম ডিভিশনের ডিসি (উপ-কমিশনার) কার্যালয়ে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্তব্যে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কথা বলেন। অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সদস্যদের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা অনৈতিক যোগসাজশ সহ্য করা হবে না। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা মৌখিক অভিযোগ পেলেও তা তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম তথ্যদাতাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, তথ্যপ্রদানকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রেখে অপরাধীদের বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, টিটনের মতো পুরনো তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের পুনরায় দৃশ্যমান হওয়া এবং প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং কারওয়ান বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সহায়ক হবে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান চ্যালেঞ্জ।