নিজস্ব প্রতিবেদক
মহান মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে বন্ধুহীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে একটি মহল সক্রিয়ভাবে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১২ তারিখের ব্যর্থ চেষ্টার পর এখন নতুন করে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শুক্রবার (১ মে) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মে দিবসের তাৎপর্য এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরাই ছিল এই সমাবেশের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিগত জুলাই আন্দোলনে শহীদ শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি জানান, ওই আন্দোলনে ৭২ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের আত্মত্যাগ নতুন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি তৈরি করেছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামলে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিল্প খাত পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই শাসন ব্যবস্থার অবসানের পর এখন দেশ পুনর্গঠনের সময় এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, “জনগণের সরকার হিসেবে আমরা দেশের শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বদ্ধপরিকর। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে চলতি সপ্তাহেই একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।” তিনি আরও জানান, দেশের অভ্যন্তরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে প্রেরণের মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।
কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নকে সরকারের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ ভালো থাকলে তবেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে। হকারদের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, জনদুর্ভোগ ও যানজট নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তাদের পুনর্বাসন এবং শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষিত ৩১ দফার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আড়াই বছর আগে আমরা রাষ্ট্র মেরামতের যে ৩১ দফা রূপরেখা দিয়েছিলাম, তাতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার গঠনের পর থেকেই আমরা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এর অংশ হিসেবে কৃষি ঋণ মওকুফ এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।” এছাড়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ অনুসরণে প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি এবং সেচ সুবিধার প্রসারে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হওয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে এবং বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে এই সুসম্পর্ক নষ্ট করার জন্য একটি গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। এই সুযোগ গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে বাংলাদেশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি।
নিজেকে শ্রমিকদের একজন হিসেবে দাবি করে তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিককে দেশ গড়ার কাজে ‘শ্রমিক’ হিসেবে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। এছাড়া বিগত আন্দোলন চলাকালে নয়াপল্টন এলাকার ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা যে সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। বক্তারা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সকলকে সজাগ থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।