বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত দুই মাস ধরে চলমান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন তাদের সামরিক ব্যয়ের একটি প্রাথমিক হিসাব প্রকাশ করেছে। তবে পেন্টাগনের এই পরিসংখ্যান নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটন যুদ্ধের প্রকৃত খরচ আড়াল করছে এবং এই সংঘাতের ফলে মার্কিন অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
সম্প্রতি পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের সাথে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন বাহিনীর পরিচালনা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বাবদ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। পেন্টাগন তাদের এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এতদিন প্রকাশ্যে না আনলেও দীর্ঘ সংঘাতের বাস্তবতায় বিষয়টি খোলাসা করতে বাধ্য হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নেতানিয়াহুর গৃহীত ‘সামরিক জুয়া’র কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি খরচ ইতিমধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করেছে। আরাগচির মতে, পেন্টাগন প্রকৃত ব্যয়ের মাত্র চার ভাগের এক ভাগ প্রচার করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এই যুদ্ধের আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের ওপর বর্তাবে। তিনি গাণিতিক বিশ্লেষণ টেনে বলেন, এই অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়ের ফলে প্রতিটি আমেরিকান পরিবারের ওপর মাসে গড়ে প্রায় ৫০০ ডলারের আর্থিক চাপ বাড়বে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন কার্যত নিজেদের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক পক্ষকে তুষ্ট করার চেষ্টা করছে।
সংঘাতের এই আবহে ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান ও দীর্ঘ সীমান্ত রেখা বিবেচনা করলে তেহরানের ওপর যেকোনো ধরনের অবরোধ বা সামরিক চাপ প্রয়োগ করা ওয়াশিংটনের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। গালিবফের মতে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের সক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করছে, যা তাদের কৌশলগত পরাজয়ের কারণ হতে পারে।
এদিকে, পেন্টাগনের দেওয়া ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাব নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট দলীয় কয়েকজন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা এবং অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই ব্যয় অনেক বেশি অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেন্টাগন সরাসরি ব্যয়ের কথা বললেও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে এই অংক কমপক্ষে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। কিছু স্বাধীন অর্থনীতিবিদের মতে, সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়-ক্ষতি, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সেনা মোতায়েনের সামগ্রিক ব্যয় ৬৩০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই বিপুল পরিমাণ সামরিক ব্যয় এক বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে বিদেশের মাটিতে নতুন করে যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়া—এই দুই সংকটের মুখে মার্কিন প্রশাসনকে নতুন করে তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি এই সংঘাতের ফলে মার্কিন করদাতাদের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব পড়ার যে দাবি তেহরান করেছে, তা যদি সত্য হয়, তবে আসন্ন নির্বাচনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।