বিশেষ প্রতিবেদক
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে দেশের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংসদের অভ্যন্তরে যদি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমাধান না আসে, তবে রাজপথই হবে শেষ আশ্রয়। শুক্রবার (১ মে) দুপুরে রংপুর মডেল কলেজ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী রংপুর মহানগর ও জেলা শাখা আয়োজিত রুকন সদস্যদের তিন দিনব্যাপী শিক্ষা শিবিরের দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণভোটের রায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে জামায়াতে ইসলামী এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘ আন্দোলন, ত্যাগ এবং বিশেষ করে ছাত্র-জনতার সুমহান আত্মদানের বিনিময়ে যে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেওয়া যাবে না। জনগণের ম্যান্ডেট বা গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত রায় বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী সংসদের ভেতরে ও বাইরে সমানতালে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এই রায় বাস্তবায়নে কোনো শৈথিল্য প্রদর্শিত হলে জনগণই এর ফয়সালা করবে।
বিগত সরকারের পতন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত নেতা আজহারুল ইসলাম বলেন, প্রায় দেড় সহস্রাধিক ছাত্র-যুবকের জীবনের বিনিময়ে দেশে যে পরিবর্তন এসেছে, তা প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় স্বাধীনতার সমতুল্য। এই পরিবর্তনের কারণেই তিনি কারামুক্ত হয়ে জনসেবায় ফেরার সুযোগ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক মিত্রদের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংসদে যাওয়ার পর ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের শপথ নেওয়া হলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সেই শপথ গ্রহণ করেনি। উল্টো তারা সংসদে গিয়ে বেশ কিছু মৌলিক অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এই প্রক্রিয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে এবং সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। উক্ত কমিটিতে সরকারের পক্ষ থেকে ১২ জন সদস্যের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং বাকি পাঁচজন সদস্যের নাম জামায়াতের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিধায় দলীয় ফোরাম এবং সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর জামায়াতে ইসলামী তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও মনোনীত প্রতিনিধিদের নাম প্রস্তাব করবে।
বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং ঐক্যের রাজনীতি নিয়েও কথা বলেন রংপুর-২ আসনের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পর। বিএনপির মধ্যে যেমন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, তেমনি জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা দেশের সেবায় নিয়োজিত আছেন। কিন্তু বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো পক্ষ ঐক্যের কথা বললেও বাস্তবে বিভেদের রাজনীতিকে উসকে দিচ্ছে। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের ধারা প্রবর্তন করেছিলেন। খালেদা জিয়াও সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান নেতৃত্বে সেই আদর্শের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটের মাধ্যমে যে রায় দিয়েছেন, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে সেটি দেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক কোনো পক্ষ যদি ক্ষমতার জোরে বা অন্য কোনো কৌশলে এই গণরায়কে উপেক্ষা করার চেষ্টা করে, তবে পরিস্থিতির দায়ভার তাদেরই নিতে হবে। তিনি বিএনপিকে ‘ভুলের রাজনীতি’ থেকে সরে এসে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করার আহ্বান জানান।
শিক্ষা শিবিরে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর মহানগর আমির এটিএম আযম খান, মহানগর সেক্রেটারি কেএম আনোয়ারুল হক কাজল এবং জেলা ও মহানগর শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। বক্তারা জনগণের অধিকার আদায়ে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট পরবর্তী জামায়াত ও বিএনপির এই বিপরীতমুখী অবস্থান দেশের আগামী দিনের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার এবং অধ্যাদেশ বাতিলের ইস্যুতে দল দুটির মধ্যকার দূরত্ব রাজপথের আন্দোলনে প্রভাব ফেলতে পারে।