বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ফুয়েল) লোডিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্যে এটিই চূড়ান্ত পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ। এই প্রক্রিয়ার সফল সমাপ্তি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ সুগম করবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী ইউরেনিয়াম ডাইঅক্সাইডের ক্ষুদ্রাকৃতির পেলেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এই জ্বালানি প্রযুক্তির সক্ষমতা সাধারণ জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় বহুগুণ বেশি। কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৫ গ্রাম ওজনের একটি ইউরেনিয়াম পেলেট থেকে যে পরিমাণ তাপশক্তি উৎপাদিত হয়, তা প্রায় এক টন কয়লা পোড়ালে প্রাপ্ত শক্তির সমান। এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে কোনো প্রকার কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পারমাণবিক রিয়্যাক্টরে এই জ্বালানি ব্যবহারের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম পেলেটগুলোকে প্রথমে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি বিশেষ টিউবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করে ফুয়েল রড তৈরি করা হয়েছে। এরপর শত শত রডের সমন্বয়ে গঠিত একেকটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি তৈরি করা হয়। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটের রিয়্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি এই ধরনের ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হবে। বিশেষজ্ঞদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই অ্যাসেম্বলিগুলো রিয়্যাক্টরের ভেতরে সুনির্দিষ্ট স্থানে ক্রমান্বয়ে স্থাপন করার মাধ্যমেই লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফুয়েল লোডিং শুরুর আগে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত যাবতীয় ছাড়পত্র ও অনুমোদন প্রদান করেছে। ফুয়েল লোডিং চলাকালীন পুরো প্রক্রিয়াটি সার্বক্ষণিকভাবে নিউট্রন ফ্লাক্স মনিটরিং বা নিউট্রন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে কোনো ধরনের কারিগরি বিচ্যুতি না ঘটে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা আমূল পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জাতীয় গ্রিডে বেজ-লোড হিসেবে সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। এটি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এই মেগা প্রকল্প। দুই ইউনিটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করল। লোডিং প্রক্রিয়া শেষে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ বা শারীরিক সূচনা সম্পন্ন হবে, যা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে নিয়ে যাবে। এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।