প্রবাস ডেস্ক
ইতালির বেরগামো প্রদেশের লেভাতে শহরে রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় শফিকুল ইসলাম (৫৫) নামের এক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গত রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শফিকুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের জাজিসার গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ২৭ বছর ধরে প্রবাসে থাকা এই শ্রমিকের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার ও নিজ গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক আগে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন শফিকুল ইসলাম। সেখানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত রোববার প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হন তিনি। লেভাতে শহরের একটি স্থানে রেললাইন অতিক্রম করার সময় দ্রুতগামী একটি ট্রেন তাঁকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীকালে স্থানীয় পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় একটি হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ওই দিন বিকেলেই ইতালিতে অবস্থানরত শফিকুলের এক প্রবাসী বন্ধু টেলিফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাঁর পরিবারকে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে তাঁর গ্রামের বাড়িতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। চার সন্তান ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন তিনি। স্বজনদের ভাষ্যমতে, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা। নিহতের ভাতিজা সাইফুল ইসলাম জানান, তাঁর কাকা দীর্ঘ প্রবাস জীবনে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছিলেন। শেষ বয়সে এসে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। এখন তাঁদের একমাত্র দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
কসবা উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকতিয়ার আলম দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শফিকুল ইসলামের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর থেকে নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে স্থানীয়রা ভিড় করছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে যাতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দ্রুত দেশে আনা সম্ভব হয়।
ইতালিতে সাম্প্রতিক সময়ে রেললাইন পারাপার বা কর্মক্ষেত্রে অসতর্কতার কারণে বেশ কিছু দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রবাসী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশের মাটিতে চলাচলের ক্ষেত্রে স্থানীয় ট্রাফিক ও নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। শফিকুলের মতো বয়োজ্যেষ্ঠ প্রবাসীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভাষার জটিলতা বা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও এমন দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই প্রবাসীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা কামনা করেছে তাঁর পরিবার ও এলাকাবাসী। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার উইংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। মরদেহ দেশে ফিরলে নিজ গ্রামে তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে। শফিকুলের আকস্মিক প্রয়াণ কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং বিদেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিকেও আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।