বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলার অবিভক্ত রাজনীতি ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কিংবদন্তি নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকার এই বরেণ্য রাজনীতিক ইন্তেকাল করেন। জননেতা এ কে ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী প্রদান করেছেন। দিবসটি পালনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বর্তমান ঝালকাঠি জেলার রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই নেতা ১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (মুখ্যমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এবং কলকাতা সিটি করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ আইনজীবী, প্রজ্ঞাবান পার্লামেন্টারিয়ান এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের অগ্রদূত।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে শেরেবাংলার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন বাংলার অবহেলিত ও নিপীড়িত কৃষক সমাজের পরম বন্ধু। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, এ দেশের সামগ্রিক উন্নতি নির্ভর করে কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর। প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, ১৯৩৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি কৃষক-শ্রমিকবান্ধব বিভিন্ন নীতি ও আইন প্রণয়ন করেন, যা বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে সহায়ক হয়েছিল।
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান দিক ছিল কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা। তাঁর সময়েই ঐতিহাসিক ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে তিনি বাংলার দরিদ্র ও নিঃস্ব কৃষকদের মহাজনি ঋণের জাঁতাকল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর এই দূরদর্শী পদক্ষেপ বাংলার কৃষি সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া ১৯৩৮ সালে ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’ সংশোধন করে তিনি জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রাথমিক ভিত গড়ে তোলেন, যা প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিক্ষার প্রসারেও শেরেবাংলার অবদান অনস্বীকার্য। তৎকালীন অনগ্রসর মুসলমান সমাজসহ সাধারণ মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন এবং দরিদ্র ছাত্রদের জন্য শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, শিক্ষা ব্যতিরেকে কোনো জাতি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে না। ফলে তাঁর প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতের তৎকালীন বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির সুযোগ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পায়।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন শেরেবাংলার মাজারে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। মাজার প্রাঙ্গণে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা ও স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে বক্তারা শেরেবাংলার আপসহীন নেতৃত্ব এবং জনসেবার মহান আদর্শ নিয়ে আলোচনা করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূর্ত প্রতীক। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে তাঁর নীতি ও আদর্শ প্রেরণা যুগিয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও শেরেবাংলার আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের যে চিন্তা তিনি তৎকালীন সময়ে করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনটি পালিত হচ্ছে।