আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের দিন ধার্য করেছেন আদালত। আজ রোববার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ প্রদান করেন। আগামী ৭ মে মামলাটির অভিযোগ গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন আদালত।
শুনানি চলাকালে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করা হয় যে, জুলাই বিপ্লবের সময় মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত নৃশংস হামলায় আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উসকানি ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে পরিচালিত ওই অভিযানে মাহমুদুর রহমান সৈকত ও ফারহান ফাইয়াজসহ অন্তত ৯ জন প্রাণ হারান। প্রসিকিউশনের দাবি, এটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মামলার মোট ২৮ জন আসামির মধ্যে মাত্র ৪ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। অন্যদিকে, মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জন আসামি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। পলাতকদের তালিকায় পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামও রয়েছে, যাদের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন আগস্টে একদফা দাবিতে রূপ নিলে তৎকালীন সরকার তা দমনে নজিরবিহীন কঠোরতা প্রদর্শন করে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও বিতর্কিত কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে তৎকালীন নীতি-নির্ধারক ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। মোহাম্মদপুরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
আইনজীবীদের মতে, এই মামলাটি জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অভিযোগ গঠনের আদেশ পরবর্তী ধাপগুলোতে মামলার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে। ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক পর্যবেক্ষণ শেষে আগামী ৭ মে অভিযোগ আমলে নেওয়া বা গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য দিনটি তালিকায় রেখেছেন। অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতেও বিচার প্রক্রিয়া আইনানুগভাবে পরিচালনার বিষয়েও প্রসিকিউশন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।