আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানকে একটি ‘বিচক্ষণ’ ও ‘টেকসই’ চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইরান চাইলে এখনো আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানকে অবশ্যই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির পথ ত্যাগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে অবস্থিত মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হেগসেথ এসব কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে পাশে নিয়ে আয়োজিত এই যৌথ ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোকপাত করা হয়।
ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইরান যদি তাদের বর্তমান নীতি পরিবর্তন করে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসে, তবে একটি সম্মানজনক ও ভালো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো ধরনের অস্থিরতা বা তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি জানান, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির পুনরুল্লেখ করে হেগসেথ স্পষ্ট করেন যে, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে তা অবশ্যই হতে হবে অর্থবহ এবং আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য।
মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিগত কয়েক বছরে যে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এই আহ্বান নতুন কোনো বার্তা বহন করছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। হেগসেথ বলেন, ইরানকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে এবং আলোচনার টেবিলে আসার পথ বেছে নিতে হবে।
এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের সমান্তরালে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও নতুন মোড় আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দীর্ঘ বিরতির পর পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে উভয় পক্ষই পুনরায় সংলাপে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও এই আলোচনার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা এজেন্ডা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে জেনারেল ড্যান কেইন সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে কথা বললেও কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি অধিক জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরানের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে ওয়াশিংটন এই ‘বিচক্ষণ’ চুক্তির প্রস্তাবটি সামনে এনেছে। তবে ইরান এই আহ্বানে সাড়া দেবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতি এবং পূর্ববর্তী পারমাণবিক চুক্তির শর্তাবলি পুনর্বহালের বিষয়ে তাদের অনড় অবস্থানের ওপর।
পেন্টাগনের এই ব্রিফিং এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন বিশ্বজুড়ে শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরান বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহে স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতত মার্কিন প্রশাসন সরাসরি আলোচনার বলটি তেহরানের কোর্টে ঠেলে দিয়ে একটি সতর্ক পর্যবেক্ষণমূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে।