শেয়ার বাজার ডেস্ক
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে সূচক ও লেনদেনের বড় উত্থান পরিলক্ষিত হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। বাজার সংশ্লিষ্টরা একে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
গত সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেনের শুরুতে ডিএসইতে বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫০ কোটি টাকা। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষে সেই মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে ১ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা বা ০.২৯ শতাংশ। বাজার মূলধন বাড়ার অর্থ হলো, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের সম্মিলিত বাজার দর গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে।
সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে সূচকটি প্রায় ৪৪ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৭৫০ পয়েন্টের উপরে। একইসঙ্গে ডিএসইর অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক এবং ডিএসইএস শরিয়াহ সূচকেও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ডিএসই-৩০ সূচকটি গত সপ্তাহে প্রায় ১৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়, যা ব্লু-চিপ বা মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।
লেনদেনের চিত্রে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর ফলে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০ কোটি টাকায়। আগের সপ্তাহে এই গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯০০ কোটি টাকার নিচে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে গড় লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। লেনদেনের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি বাজারের তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য ছিল ব্যাংকিং, ওষুধ ও রসায়ন এবং বস্ত্র খাতের। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারে পুনঃবিনিয়োগ শুরু করায় সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এছাড়া বেশ কিছু ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির বার্ষিক লভ্যাংশ ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও শেয়ার সংগ্রহের প্রবণতা দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ এবং ব্যাংকগুলোর শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো অনুকূলে থাকায় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে বাজারে এই উত্থান কতটুকু স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে সামনের দিনগুলোতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন এবং লভ্যাংশ ঘোষণার ওপর।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে মোট ৩৯৮টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ২০৫টির, দর কমেছে ১৫৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৮টি কোম্পানির শেয়ার দর। দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল প্রকৌশল ও সেবা খাতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, লভ্যাংশ প্রদানের রেকর্ড ডেট পরবর্তী সময়ে কিছু কোম্পানির শেয়ার দরে সংশোধন দেখা গেছে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, সূচক ও লেনদেনের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রাখতে হলে বাজারে মানসম্মত নতুন শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বাজারে কারসাজি রোধে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, গুজবে কান না দিয়ে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা এবং লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মানসিকতা থাকলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি থেকে ভালো মুনাফা অর্জন সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
আগামী সপ্তাহেও যদি লেনদেনের এই গতিশীলতা অব্যাহত থাকে, তবে ডিএসইএক্স সূচকটি পরবর্তী মনস্তাত্ত্বিক বাধা ৬ হাজার পয়েন্টের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে, বিদায়ী সপ্তাহের এই উত্থান বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে।