আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা নিরসনে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য সস্ত্রীক ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট শুক্রবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ইরানি পক্ষ আলোচনার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কুশনার ও উইটকফকে ইসলামাবাদে পাঠিয়েছেন মূলত ইরানের প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনার জন্য। লিভিট আরও জানান, যদি এই প্রাথমিক আলোচনা ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পরবর্তী পর্যায়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেন। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে প্রথম দফা আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভ্যান্স।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোনো বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের পর্যবেক্ষণ এবং শর্তগুলো মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরা হবে। ইসলামাবাদে ইরানি দূতাবাস জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তেহরানের জন্য একটি ‘যথাযথ চুক্তির’ প্রস্তাব দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, ইরানকে অবশ্যই অর্থবহ এবং যাচাইযোগ্য উপায়ে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের ঘোষণা দিতে হবে। হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ক্রমান্বয়ে জোরদার করা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই আলোচনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। তিনি ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধকে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ‘জিম্মি’ করার শামিল বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, তেহরান আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। তবে তিনি শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘হুমকি ও অবরোধ’ বন্ধের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে যুদ্ধের ব্যাপারে অনমনীয় মনোভাব দেখালেও নেপথ্যে একটি সম্মানজনক চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে। বুধবার শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে ট্রাম্প সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। ইসলামাবাদে চলমান এই পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসন এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।