আইন ও বিচার ডেস্ক
দেশের বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দীর্ঘসূত্রতা দূরীকরণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সহজলভ্য করতে আদালতের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ একটি কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ডিজিটাল আদালত ব্যবস্থার দিকে এই অগ্রযাত্রা বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে আদালতের যোগাযোগের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, বিচার বিভাগকে আধুনিকায়ন করতে ইতোমধ্যে ই-জামিন বন্ড ব্যবস্থাপনা, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, অনলাইন কজ লিস্ট (কার্যতালিকা) এবং বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের ডিজিটালকরণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের নয়টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ই-জামিন বন্ড ব্যবস্থাপনা চালু হওয়ায় আইনজীবী, কারা কর্তৃপক্ষ ও মামলাকারীদের সময় ও আর্থিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে এসব জেলায় অনলাইনে জামিননামা জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই ব্যবস্থার সফলতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর ফলে জামিন সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হবে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্যের সঠিকতা যাচাই সহজ হবে।
অনুরূপভাবে, দেশের দুটি জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট বা ইলেকট্রনিক পারিবারিক আদালত চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত মামলাসমূহ অনলাইনে দাখিল, শুনানি ও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এই পদ্ধতির ফলে বিচারপ্রার্থীদের বারবার সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমেছে, যা বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে ‘অনলাইন কজ লিস্ট’ বা মামলার অনলাইন কার্যতালিকা একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পূর্বে মামলার পরবর্তী তারিখ জানতে বিচারপ্রার্থীদের সশরীরে আদালতে উপস্থিত হতে হতো অথবা মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন বিচারপ্রার্থীরা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের মামলার সর্বশেষ অবস্থা এবং শুনানির তারিখ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি তথ্য আদান-প্রদান আরও সহজ করতে দেশের সকল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ‘তথ্য ও সেবা কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে মামলা-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ এবং শুনানির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীরা প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা পাচ্ছেন।
সরকারের বৃহত্তর রূপকল্পের অংশ হিসেবে সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস (সিআরভিএস) উদ্যোগের অধীনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে এই কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে নথিপত্র জালিয়াতি বা তথ্য বিকৃতি থেকে উদ্ভূত পারিবারিক ও দেওয়ানি বিরোধ অনেকাংশে কমে আসবে।
এই সকল খণ্ডকালীন উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্প ‘ই-জুডিশিয়ারি’। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় প্রদান এবং নথি সংরক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত বিচারিক কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসা। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিচার বিভাগ একটি সম্পূর্ণ কাগজবিহীন (Paperless) কর্মপরিবেশে প্রবেশ করবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো এবং দ্রুত ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ডিজিটাল ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে দেশের আদালতে বিদ্যমান বিপুল সংখ্যক মামলার জট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে: নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থার সুফল প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।