অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সরকার ভোক্তা পর্যায়ে তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। রোববার (১৯ এপ্রিল) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও মূল্য সমন্বয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা আজ থেকে সারাদেশে কার্যকর হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, অকটেনের ২০ টাকা, পেট্রোলের ১৯ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেলের বাজার অস্বাভাবিক অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ যে মূল্যে তেল আমদানি করছে, বর্ধিত মূল্যের পরও বর্তমান বিক্রয়মূল্য সেই আমদানিকৃত দরের নিচেই অবস্থান করছে। অর্থাৎ, সরকার এখনো সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে।
ভর্তুকির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতিটি লিটারে বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হচ্ছে। সঠিক পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে সংগ্রহ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, জনস্বার্থে সরকার একটি সহনীয় মাত্রায় মূল্য সমন্বয় করার চেষ্টা করেছে। এপ্রিল মাসে দাম না বাড়ানোর পূর্ববর্তী আশ্বাসের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সরকার দাম না বাড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান এবং আমদানি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের পরিবহন খাত, কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং সাধারণ জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, যেকোনো ধরনের মূল্যবৃদ্ধিই জনজীবনে প্রভাব ফেলে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একার নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্য পরিবহন খরচ এবং সেচ পাম্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি খাতে উৎপাদন খরচ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার এই প্রভাব মোকাবিলায় বাজার মনিটরিং এবং বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ার কথা ভাবছে। গত দেড় মাস ধরে দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের অবসান ঘটাতে এই মূল্য সমন্বয় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসলে পুনরায় দেশীয় বাজারে তা সমন্বয় করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ কমানোই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান লক্ষ্য।