আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও এজিয়ান সাগরের নিয়ন্ত্রণ এবং খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের অধিকারকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও গ্রিসের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে রূপ নিয়েছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যকার ঐতিহাসিক তিক্ততাকে কাজে লাগিয়ে অঞ্চলটিতে নিজের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসরাইল। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসকে ব্যবহারের মাধ্যমে তুরস্কের বিরুদ্ধে একটি ‘কৌশলগত পরিবেষ্টন’ তৈরির চেষ্টা করছে তেল আবিব।
তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যকার বিরোধের মূলে রয়েছে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, মহাদেশীয় তাক (কন্টিনেন্টাল শেলফ) এবং বিভক্ত দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের সার্বভৌমত্ব। গ্রিস লোজান চুক্তির দোহাই দিয়ে তাদের দ্বীপগুলোর ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা দাবি করলেও তুরস্ক তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। আঙ্কারার মতে, গ্রিসের এই অবস্থান তুরস্কের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের অধিকারকে চরমভাবে সংকুচিত করে। এই দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনাকে পুঁজি করে ইসরাইল গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সঙ্গে নিবিড় সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
২০১০ সালে গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহর ‘মাভি মারমারা’য় ইসরাইলি হামলার পর তুরস্কের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর ফলে ইসরাইলি বিমানবাহিনীর জন্য তুর্কি আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে ইসরাইল গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের আকাশসীমা ব্যবহার শুরু করে। বর্তমানে এই দেশ দুটির ভূখণ্ডে ইসরাইলি বাহিনী বড় আকারের সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার বোমাবর্ষণ এবং মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার প্রশিক্ষণগুলো ইরানের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জনে ইসরাইলকে সহায়তা করছে।
ইসরাইলের এই তৎপরতাকে গত শতকের ‘প্রান্তিক জোট’ মতবাদের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভৌগোলিকভাবে সংকীর্ণ দেশ হওয়ায় ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যিক পথ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেভিয়াথান ও তামার গ্যাসক্ষেত্রের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসকে একটি ‘বাফার জোন’ হিসেবে ব্যবহার করছে দেশটি। বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে এই দুই দেশ ব্রাসেলসে ইসরাইলের পক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে।
তুরস্ককে সামরিকভাবে চাপে রাখতে গ্রিস সম্প্রতি ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামক একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ইসরাইলের ‘আয়রন ডোম’ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ব্যবস্থায় স্পাইডার, বারাক এমএক্স এবং ডেভিড’স স্লিংয়ের মতো উন্নত সমরাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও সীমাবদ্ধ করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের এই প্রক্সি কৌশল ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। জোটের এক সদস্যের বিরুদ্ধে অন্য সদস্যকে প্ররোচিত করার মাধ্যমে ইসরাইল প্রকারান্তরে ন্যাটোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তুরস্ককে তার নিজস্ব উপকূলরেখায় সীমাবদ্ধ রেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এই বহুমুখী বেষ্টনী মোকাবিলায় আঙ্কারার পরবর্তী সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।