আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহব্যাপী চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ‘মাঠে জয়ী’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সম্প্রতি জাতীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, তেহরানের দেওয়া শর্তসমূহ ওয়াশিংটন মেনে নেওয়ায় ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই সংঘাতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তার ভাষণে উল্লেখ করেন, ইরান এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শত্রুপক্ষ ইরানের ওপর নিজেদের একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। স্পিকারের মতে, চলমান এই যুদ্ধবিরতি ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক শক্তিমত্তারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, “আমরা যদি যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়ে থাকি, তবে তা কেবল আমাদের নির্ধারিত শর্তাবলি তারা মেনে নেওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে।”
ইরানি স্পিকারের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের মধ্যকার বৈরিতা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গালিবাফ তার বক্তব্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আলোচন বা ‘নেগোশিয়েশন’ হচ্ছে সংগ্রামেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরানের এই কঠোর অবস্থান নির্দেশ করে যে, দেশটি কোনোভাবেই তার সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত বিজয়। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে ইরানের আধিপত্য বজায় থাকা মানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর তেহরানের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিপরীতে এই অবস্থান ধরে রাখা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গালিবাফের মতো রক্ষণশীল নেতাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
যুদ্ধের এই সাময়িক বিরতি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় রয়েছে। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের এই দাবি ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যেকার মনস্তাত্ত্বিক লড়াইকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের বিজয় হিসেবে প্রচার করা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। মূলত শর্তাধীন এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এড়াতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে দুই দেশের এই সমঝোতা কতটুকু কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে ইরানের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তারা সামরিক ময়দানের পাশাপাশি কূটনৈতিক টেবিলেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে বদ্ধপরিকর। আগামী দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরীর অবস্থান এবং ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি।